সুলিভান ভাইদের চোখ এখন বিশ্বকাপে

রোনান ও ডেকলান সুলিভান। ছবি: সংগৃহীত
জীবনের মাত্র দুবার 'পানেনকা’ শট চেষ্টা করেছিলেন রোনান সুলিভান। যার একটি লেগেছিল ক্রসবারে। কিন্তু অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গোলশূন্য ড্র হওয়া ফাইনালে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে সেই পানেনকাই নেন রোনান। তার জমজ ভাই ডেকলান অবশ্য বিন্দুমাত্র অবাক হননি তাতে।
সেন্ট জোসেফ ইউনিভার্সিটির ডরমিটরির সোফায় ভাইয়ের পাশে বসে ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে ডেকলান বললেন,‘ওকে মুখ ফুটে কিছু বলতেও হয়নি, আমি জানতাম ও এটাই করতে যাচ্ছে। আমি জানতাম ট্রফি জেতার জন্য শেষ শটটা যদি ও পায়, তবে ও পানেনকাই মারবে। এটাই ওর ধরন।’
কিছু মুহূর্ত পরেই বলটি শূন্যে ভেসে গিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। মালদ্বীপের মালেতে হাজার হাজার দর্শক গর্জে ওঠেন। রোনান এ নিয়ে বলেন, ‘কেউ যদি আমাকে আগে বলত যে এমন নাটকীয় কিছু হতে যাচ্ছে, আমি বিশ্বাসই করতাম না।’
মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বললেন,‘বিমান থেকে নেমে ওখানে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটা ছিল অসাধারণ। পানি এত নীল! এমন কিছু আমি আগে কখনো দেখিনি। নিউ জার্সির ওশান সিটিতে পানি একদম বাদামী, কিন্তু ওটাই ছিল আমাদের প্রিয় জায়গা। তাই মালদ্বীপের এই নীল পানি দেখে আমরা চমকে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল দ্য ওয়াটার বয় সিনেমার সেই বিশেষ পানি যেন!’
পুরো ঘটনাটাই যেন হলিউড সিনেমার গল্পের মতো। ফিলাডেলফিয়ার খাঁটি আইরিশ নামের দুটি ছেলে, যারা এর আগে কখনো বাংলাদেশে পা-ই রাখেনি। টুর্নামেন্টের আগে ট্রায়ালের জন্য তারা দলটিতে যোগ দেয় এবং কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে আসে ট্রফি হাতে বীরের বেশে।
ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৮১তম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হয়তো কেবল একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। এই প্রবাসীদের বেশিরহভাগ দক্ষিণ এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতেও একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে।
ডেকলান বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেকেই আমাদের এই অভিজ্ঞতা দেখে উৎসাহিত হয়েছে। এখন হঠাৎ করেই দেখছি অনেক প্রবাসী খেলোয়াড় বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইংল্যান্ডের ভালো একাডেমির কিছু ছেলেও আছে। সারা বিশ্বেই আমাদের প্রতিভা আছে, এখন শুধু সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।’
সেভ বাংলাদেশ ফুটবল পেজ থেকেই প্রথম যোগাযোগ করা সুলিভান ভাইদের সঙ্গে। তারা পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে এই দুই ভাইকে যুক্ত করে দেয়। তবে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর লাল গালিচা সংবর্ধনা মেলেনি। দলে সুযোগ পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড়ের সঙ্গে ট্রায়াল দিতে হয়েছিল তাদের। ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, মাঠে বল পাওয়ার পর নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে তারা সবার মন জয় করে নেন তারা।
ডেকলান বলেন, ‘সবকিছু শুরু হয়েছিল ইনস্টাগ্রামের একটি ডিএম দিয়ে, যা সত্যিই একটু অদ্ভুত।’ পাসপোর্ট পাওয়ার আগেই একটি ফ্যান পেজ কীভাবে তাদের ট্রায়াল ক্যাম্পে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে সেটা বিস্ময়কর ছিল তাদের জন্য। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ প্রকাশের পর সেই অ্যাকাউন্টটিই সুলিভানদের ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
এখন তাদের স্বপ্নের সীমাটা আরও বড়। সুলিভান ভাইদের স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ ফুটবলে দেখা। ডেকলান বলেন, ‘যখনই ৬৪ দলের বিশ্বকাপের কথা ভাবি, মনে হয় সব সেরা খেলোয়াড়দের এক করতে পারলে আমাদের সুযোগ আছে। সেটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য।’
শুরুতে অভিযোগ ছিল প্রবাসী খেলোয়াড়দের বল পাস দেন না স্থানীয়রা। এর কারণ নিয়ে রোনান বলেন, ‘প্রবাসী খেলোয়াড় হলে শুরুতে বল পাওয়াটা একটু কঠিন, কারণ আপনি ভাষা জানেন না এবং হয়তো দলের বাকি খেলোয়াড়রা আমাদের সেখানে উপস্থিতিতে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল না। কিন্তু একবার দুবার বল পেয়ে নিজের সামর্থ্য দেখাতে পারলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়।’






