ইনফান্তিনো কি টিকে থাকতে পারবেন?

সংগৃহীত ছবি
সময়টা খুব দ্রুত বদলাচ্ছে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য। বিশ্বকাপ চলার সময় প্রায় সব ভেন্যুতে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে ফিফা সভাপিত ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। ১৯ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দাঁড়িয়ে স্পেনের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়ার সময় তিনি নিশ্চয়ই নিজেকে সাফল্যের চূড়ায় দেখছিলেন।
দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে চিত্রটা পুরো উল্টে গেছে। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পর ইনফান্তিনো এখন নিঃসঙ্গ। তিনি যেন হাঁটছেন কানাগলিতে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের তীব্র নিন্দা কিংবা যে খেলাকে তিনি রক্ষা করার দাবি জানান সেই ফুটবলের ভক্তদের কটূক্তি-এগুলোকে কাজের একটি সাধারণ অংশ হিসেবে হয়তো এড়িয়ে যাওয়া যায়। তবে ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি এবং কনকাকাফ ও এএফসির সেই অবস্থানকে সমর্থন দেওয়াকে এত সহজে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এই তিনটি সংস্থাই তাদের নিজস্ব উপায়ে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে ইনফান্তিনোর অধীনে ফিফা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এএফসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘এই বিষয়টি কেবল একটি একক প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি ফিফার পরামর্শ গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার মৌলিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে, যা এখন সংশোধন করা জরুরি।’
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ফিফার বেশিরভাগ সদস্য তার খেলা পরিচালনার যোগ্যতার ওপর থেকে হয় আস্থা হারাচ্ছে, নয়তো পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। ইনফান্তিনোর বিশেষ উপদেষ্টা এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ট্রাম্পের গঠিত হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্সের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেছেন।
ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, এই প্রকল্পের ব্যাপারে ফিফার নিজস্ব প্রশাসনকেও ‘প্রতারিত’ করা হয়েছিল। মনে হচ্ছে ইনফান্তিনোর চারপাশের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে আর তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
ইনফান্তিনো কি সত্যিই বিদায় নেবেন?
ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টাইন ইনফান্তিনোকে নিয়ে বলেছেন,‘যে কোনো সাধারণ সংস্থায় এত বড় একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কাউকে যদি পিছু হটতে হতো, তবে তাকে হয়তো দরজার পথ দেখিয়ে দেওয়া হতো (বহিষ্কার করা হতো)। কিন্তু ফিফা কোনো সাধারণ সংস্থা নয়। পর্যাপ্ত জাতীয় সংস্থার সমর্থন যদি তার সঙ্গে থাকে, তবে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।’
ফিফার সাবেক সহ-সভাপতি জিম বয়েস মনে করেন, আবারও নির্বাচিত হওয়ার জন্য ইনফান্তিনোর কাছে ‘এখনও পর্যাপ্ত সমর্থন’ থাকবে। তবে তিনি যোগ করেন, ‘পরিস্থিতি যদি এই গতিতেই খারাপ হতে থাকে, তবে কে জানে কী হবে!’
ইনফান্তিনো ২০১৬ সাল থেকে ফিফা সভাপতির দায়িত্বে আছেন। তার আগে সাত বছর তিনি উয়েফার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফুটবল রাজনীতির অলিগলি তার চেয়ে ভালো খুব কম মানুষই চেনেন।
৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খালিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে হারিয়ে প্রথমবার সভাপতি হন। দুর্নীতির অভিযোগে সেপ ব্লাটারের পদত্যাগের পর ফিফার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করাই ছিল তার মূল কাজ। অবশ্য গত বছর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পান ব্লাটার।
সভাপতি হওয়ার পর ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘ফিফাকে ফুটবলে এবং ফুটবলকে ফিফায় ফিরিয়ে আনতে আমি ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাব।’
এরপর দুইবার তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ধারণা করা হচ্ছিল আগামী বছরের মার্চেও একই ঘটনা ঘটবে। এটি ফিফায় অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্লাটার ২০০৭ এবং ২০১১ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর ১৯৭৪ সালে স্যার স্ট্যানলি রৌসকে হারিয়ে সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি পদে পরিবর্তন এনেছিলেন ব্রাজিলের জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ। ৮২ বছর বয়সে ১৯৯৮ সালে পদত্যাগ করার আগে টানা পাঁচটি মেয়াদে হ্যাভেলাঞ্জের বিপক্ষে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি।
ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়ে এরই মধ্যে সমর্থনপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেগুলো কি প্রত্যাহার করা হবে? উত্তরটা সময়ের হাতে।
টাইমলাইন
২৭ জুলাই: ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তার ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৫টি স্লাইডের একটি পোস্টে সমালোচকদের বলেন-তার নেতৃত্ব নিয়ে ‘ঘৃণা ও মিথ্যা গুজব না ছড়িয়ে’ বরং তাদের ‘ধ্যান করা, প্রার্থনা করা কিংবা ফুটবল ম্যাচ দেখা’ উচিত।
২৮ জুলাই: দ্য টাইমস ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায় ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করছেন। ফিফা বিবৃতি দিয়ে এই পরিকল্পনার সত্যতা স্বীকার করে। উয়েফা তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বলে, ‘ফুটবল বিক্রি করার অধিকার ফিফার নেই’।
২৯ জুলাই: ইনফান্তিনো ফিফার ২১১টি সদস্য দেশকে চিঠি দিয়ে জানান, পরিকল্পনা সমর্থন করলে তারা ৪ কোটি ডলার পাবে। তবে প্রথম ধাপের ২ কোটি ডলার পেতে হলে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। উয়েফা মন্তব্য করে, ‘ফিফা নিজেদের ও বন্ধুদের সমৃদ্ধ করার জন্য আমাদের খেলাটিকে ব্যবহার করা চালিয়ে যেতে পারে না।’
৩০ জুলাই: উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ একযোগে ভোট দিয়ে জানায়, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা কার্যকর করা হলে তারা বিশ্বকাপ বয়কট করবে। কনকাকাফ জানায়, তাদের ৪১টি সদস্য দেশও এই প্রস্তাব ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে।
৩১ জুলাই: ফিফা দাবি করে ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’ এবং তারা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন জানায়, তারা উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে ‘একাত্মতা প্রকাশ করছে’, তবে সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা থেকে বিরত থাকে। ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর জানান, এই প্রকল্প নিয়ে ফিফার নিজস্ব প্রশাসনকে ‘প্রতারিত’ করা হয়েছে।
১ আগস্ট: ইনফান্তিনো এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, এই পরিকল্পনা আর সামনে এগোবে না।




