শান্ত-মুমিনুলে প্রথম দিনটা বাংলাদেশের

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের ব্যাটারদের। সেঞ্চুরি করেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, ৯ রানের জন্য সেঞ্চুরি হাতছাড়া হয়েছে মুমিনুল হকের। হাফসেঞ্চুরি থেকে ২ রান দূরে মুশফিকুর রহিম। প্রথম দিনের খেলা শেষে ৮৫ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৩০১ রান। মুশফিক ৪৮* ও লিটন ৮ রানে দিনের খেলা শেষ করেছেন।
হাঁটুর চোটে ছিটকে গেছেন বাবর আজম, তাই পাকিস্তানের একাদশে অভিষেক হল দুই ক্রিকেটারের। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে আজান আওয়াইজের একাদশে আসাটা প্রত্যাশিতই ছিল, ওয়ান ডাউনে আব্দুল্লাহ ফজল চলে এলেন বাবর না খেলতে পারায়। শান মাসুদ টস জিতলেন এবং বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠালেন।
শুরুর একটা ঘন্টা পাকিস্তানের পেস বোলাররা বেশ ভুগিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। মাহমুদুল হাসান জয় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বাঁচলেও ৮ রানের বেশি করতে পারেননি, সাদমান ইসলামও ৩০ বলে ১৩ রান করে আউট। ৩১ রানে বাংলাদেশের ২ উইকেট নেই, এখান থেকেই লড়াইটা শুরু শান্ত-মমিনুলের।
কোণঠাসা অবস্থায় থাকলে একটা সময় চাপের মুখে আরও নুয়ে পড়তেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, তবে জীবনের অন্যতম সেরা ছন্দে থাকা শান্ত চাইলেন পালটা আক্রমণ করে পাকিস্তানের বোলারদের চমকে দিতে। একদিকে মমিনুল ছিলেন ধীরস্থির, শান্ত আগ্রাসী। মোহাম্মদ আব্বাসের বলে চমৎকার একটা বাউন্ডারি দিয়ে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। এরপর বাজে বল পেলেই চেয়েছেন বাউন্ডারি মারতে। সালমান আলি আগা আর আব্বাসের বলে মেরেছেন একটা করে ছয়। দৃষ্টিনন্দন ড্রাইভ, পৌরুষদীপ্ত পুল সবই দেখা গেছে শান্ত'র ব্যাটে।
দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে মুমিনুল হকও বলে গেলেন, শান্ত'র ব্যাটিং তাকে মনে করিয়ে দেয় সেরা ছন্দে থাকা তামিম ইকবালের কথা। কন্ডিশন যত খারাপই হোক, প্রতিপক্ষ যে দলই হোক না কেন তামিম রান করতেন নিজস্ব ছন্দেই, বলেছেন তামিমের সঙ্গে অনেকগুলো জুটির অংশীদার মুমিনুল।
আব্বাসের বলে কাভার ড্রাইভে টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পরের বলটাতেই শান্ত আউট হয়ে গেলেন লেগ বিফোর উইকেট হয়ে। দিনের খেলার শেষে এসে আব্বাস বললেন, বলটা ঠিক যেভাবে করতে চেয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই হয়েছিল, 'ক্রিকেটের সৌন্দর্যই এখানে। এই মুহূর্তটির জন্য আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, আর সেও (ব্যাটার) বেশ ভালো খেলছিল। ওই নির্দিষ্ট বলটিতে আমি পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন এনে ইন-সুইং করানোর চেষ্টা করি এবং বলটি সুইং করে। মাঝেমধ্যে বল সুইং করে, আবার কখনও করে না—এ কারণেই আমি বলছি এটি একটি ভালো উইকেট ছিল। আম্পায়ার শুরুতে আউট দেননি কারণ তার মনে হয়েছিল ব্যাটে লেগেছে, কিন্তু বোলার হিসেবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে বল ব্যাটে লাগেনি, তাই আমি রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।'
শান্ত আর মমিনুলের ১৭০ রানের জুটি গড়ে দেয় বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত, তার উপর মুমিনুল ও মুশফিক মিলে আরো ৭৫ রান যোগ করেন।
যখন মনে হচ্ছিল সেঞ্চুরিটা পেয়েই যাবেন মুমিনুল, তখনই সারাদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত বল করে যাওয়া নোমান আলির একটা ডেলিভারি নিচু হয়ে এসে লাগল তার পায়ে। আম্পায়ার দিলেন আউট, রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারলেন না ৯১ রান করা মুমিনুল। ১৩ নম্বর শতকটা করেছিলেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ভারতের বিপক্ষে কানপুরে। ১৩ থেকে ১৪ নম্বর শতকে যাবার পথে ৯ টেস্টে ১৫ ইনিংসে ৬ বার পঞ্চাশ ছাড়িয়েছেন মুমিনুল। দুইবার আউট হয়েছেন ৮০'র ঘরে, এবার আউট হলেন ৯১ রানে। 'সেঞ্চুরির আনলাকি থার্টিন' এর প্যাঁচেই বুঝি আটকে গেছেন মুমিনুল!
একটা সময় মুশফিক ছিলেন 'পঞ্চপান্ডব' এর একজন। সেই পান্ডবদের সবারই ক্রিকেটার জীবনের ইতি ঘটেছে। মুশফিক রয়ে গেছেন ২২ গজেই, পান্ডব থেকে অমর অশ্বথামা হয়ে। ১০১তম টেস্ট খেলতে নেমেছেন শুক্রবারে, এখনো প্রস্তুতিপর্বে পরিশ্রমের মাপকাঠিতে মুশফিককে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। যার প্রমাণটাও মুশফিক রাখেন মাঠে। শুক্রবার ৪৮ রানে অপরাজিত থেকে দিনের খেলার শেষটা করেছেন মুশফিক, বাড়তে দেননি বাংলাদেশের বিপদ।
মুমিনুলের ভাষায়, মুশফিক থাকা মানেই আস্থা, 'মুশফিক ভাই বাংলাদেশ দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় । তিনি ভালো খেলুন বা না খেলুন, তার দলে থাকাটাই অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা । তার অভিজ্ঞতা থেকে অধিনায়কসহ দলের সবাই অনেক কিছু শিখতে পারে । তিনি যখন ক্রিজে থাকেন, তখন আমরা ড্রেসিংরুমে অনেক নিশ্চিন্ত বোধ করি।'
বাংলাদেশ দল তাই প্রথম দিন শেষে অনেকটাই নিশ্চিন্ত কারণ মুশফিক আছেন, সঙ্গে ৮ রান করা লিটন দাস। দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের ইনিংসটা যতটা সম্ভব বড় হোক, এটাই চাইছেন মমিনুল আর আব্বাস চাইছেন যতটা সম্ভব দ্রুত বাকি ৬ উইকেট নেয়া যায়। মুমিনুল বললেন শুরুর একটা ঘন্টা দেখে খেলতে কারণ দ্বিতীয় নতুন বলের বয়স মাত্র ৫ ওভার, ঠিক একই কারণে দিনের প্রথম ঘন্টা কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব উইকেট তুলে নিতে চান আব্বাসও।
মিরপুরের উইকেটকে যতই রহস্যময় তকমা দেয়া হোক না কেন, ঢাকা টেস্টের প্রথম দিন শেষে দুই দলেরই ক্রিকেটারের মিল একটা জায়গাতেই। চমৎকার স্পোর্টিং উইকেট, পেসাররাও একটা সময় সুবিধা পেয়েছে আবার ব্যাটসম্যানরাও রান করতে পেরেছে। কোনও এক পক্ষের দিকে হেলে নেই উইকেট, এখানে ভাল ক্রিকেট খেললে ব্যাটিং বা বোলিং দুটোতেই সফল হওয়া সম্ভব। আরও একটা জায়গা মুমিনুল-আব্বাস দুজনেই একমত। দ্বিতীয় দিনে কারা এগিয়ে যাবে, সেটা ঠিক করে দেবে দিনের প্রথম এক ঘন্টা।




