সরষের মধ্যেই ভূত!

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হয়েছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সব নাটক। দেশের ক্রিকেটের ভালো-মন্দের দায় বিসিবির হলেও বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল মন্ত্রণালয়। আবার নিজেদের নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের এখন তদন্তও করছে তারা। সরষের মধ্যেই তো ভূত থাকতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার আসলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এ বছরের ১৩ জানুয়ারি। ওইদিন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু হওয়া চিঠিই তার প্রমাণ। আগামীর সময়ের হাতে আসা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ আছে, ‘ভারতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কোনো ম্যাচে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা না রাখার জন্য বলছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।’ পাশাপাশি তাদের লিখিত পরামর্শ, ‘বিসিবিকে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে আইসিসির সঙ্গে অলোচনা করার পরামর্শ দিচ্ছে।’
চিঠির আট দিন পর ২২ জানুয়ারি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ক্রিকেটারদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার সভা করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সভায় আসলে তার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল ক্রিকেটার ও বিসিবির কর্তাদের। এরপর তিনি সংবাদ মাধ্যমে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ফেব্রুয়ারিতে এসেই এ উপদেষ্টা আবার বদলে ফেলেন নিজের কথা। জাতীয় নির্বাচনের আগে ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি সব দায় চাপিয়েছেন ক্রিকেটারদের ঘাড়ে, ‘না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা এবং ক্রিকেট বোর্ড।’ একেক সময় তার কণ্ঠে একেক সুর। তার আগে-পরের কথার কোনো মিল নেই। তবে ক্রিকেটাররা কখনো প্রকাশ্যে বিশ্বকাপ না খেলার পক্ষে মত দেননি, এটিই সত্য। তাই আসিফ নজরুলের কথা শুনে বিসিবির কোচ সালাউদ্দিন ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন বিশ্বকাপ খেলতে না পেরে ক্রিকেটারদের হতাশ হয়ে পড়ার কথা।
এজন্যই তদন্ত কমিটি কি না কে জানে। তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার কারণ জানতে তদন্ত কমিটি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এখানকারই সিনিয়র সহকারী সচিব অংগজাই মারমা স্বাক্ষরিত চিঠিতে ড. এ কে এম অলি উল্যাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিন করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য বিসিবির প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
মজার ব্যাপার হলো, সবই তো করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার চিঠি ইস্যু করেছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। তার সঙ্গে কথা বললেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল— এর জবাবে তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে নির্দেশনা এসেছিল, আমি সে অনুযায়ী কাজ করেছি। তাই চিঠি ইস্যু করেছি।’ নিশ্চয়ই সেই নির্দেশনা ছিল তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের। তিনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তৎকালীন বিসিবিপ্রধান আমিনুল ইসলামের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন কি না, তা এক বিশাল প্রশ্ন। কারণ, ক্রিকেটের ভালো-মন্দ বোঝার দায়িত্ব বোর্ড সভাপতির।
ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করা তদন্ত কমিটির কাছে সচিবের জবাবদিহি করা উচিত। কমিটির মুখোমুখি হবেন কি না— জানতে চাইলে মাহবুব-উল-আলমের জবাব, ‘তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হব কি না, তা আমি আপনাকে জানাতে বাধ্য নই।’ এ কথা তিনি বলতেই পারেন, তদন্ত কমিটিকে আলোর পথে নিয়ে যেতে পারেন এই সচিবই।
৪ জানুয়ারি
বিসিবি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আইসিসিকে ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে অন্য দেশে নেওয়ার অনুরোধ করে।
১৩ জানুয়ারি
বিসিবিকে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে আইসিসির সঙ্গে অলোচনা করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা হয় চিঠি।
১৭ জানুয়ারি
বাংলাদেশ সরকারকে রাজি করাতে ঢাকায় আসেন আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান এন্ড্রু এফগ্রেড।
২২ জানুয়ারি
ক্রিকেটারদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার সভা করেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
১০ ফেব্রুয়ারি
বিশ্বকাপ না খেলার দায় আসিফ নজরুল চাপান ক্রিকেটারদের ঘাড়ে




