মোসাদ্দেকের ফেরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চার বছর ধরে যে দরজাটি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটিই আবার খুলে গেল আলো ছড়িয়ে। জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত শুধু একটি ইনিংস খেলেননি, নিজের ক্রিকেট-জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ যখন চাপে, তখন ব্যাট হাতে দায়িত্ব তুলে নেন মোসাদ্দেক। ৭০ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। পরে বল হাতেও ১০ ওভারে মাত্র ৩৭ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে ফিরে এমন অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ম্যাচের অন্যতম আলোচিত চরিত্র হয়ে ওঠেন এই ডানহাতি অলরাউন্ডার।
এই প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধুই একটি ইনিংসে বোঝানো যাবে না। এটি অপেক্ষার, লড়াইয়ের এবং নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার গল্প।
২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার ছিলেন এই ক্রিকেটার। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা তার ব্যাটিং নিয়ে বেশ প্রশংসাও করেছিলেন। সাবেক অধিনায়কের বক্তব্য ছিল, ‘মোসাদ্দেক কীভাবে যেন মেরে দেয়।’ এটা মোসাদ্দেকের ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রমাণও। চাইলেই যেকোনো শট খেলতে পারেন এই অলরাউন্ডার, আর তা খুব সাবলীলভাবেই।
অথচ ২০২২ সালের পর ওয়ানডে দলে আর জায়গা হয়নি মোসাদ্দেকের। একসময় বাংলাদেশের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচিত হলেও ধীরে ধীরে নির্বাচকদের পরিকল্পনার বাইরে চলে যান তিনি। এ নিয়ে নির্বাচকদের বিভিন্ন মতামতও ছিল। জাতীয় দলের দরজা বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হয়তো তার অধ্যায় শেষ। কিন্তু মোসাদ্দেক হাল ছাড়ার পাত্র নন।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে নতুন করে গড়েছেন। এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে ছিলেন দুর্দান্ত পারফরমার। ব্যাট হাতে ছিলেন ভরসার মানুষ, করেছেন একটি সেঞ্চুরি ও দুটি ফিফটি। দলের প্রয়োজনে বল হাতেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে আবারও নির্বাচকদের নজরে আসেন তিনি। ফলে জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়ে যান।
এই সুযোগটা আরও আগেই পেতে পারতেন আবাহনী অধিনায়ক। কিন্তু সাবেক প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু একসময় বলেছিলেন, মেহেদী হাসান মিরাজ দলে থাকলে মোসাদ্দেকের জন্য ওয়ানডে দলে ফেরা কঠিন। কারণ, দুজনই প্রায় একই ধরনের অলরাউন্ডার।
নির্বাচক প্যানেলে পরিবর্তনের পর চিত্রও বদলে যায়। গাজী আশরাফ হোসেন নির্বাচক হিসেবে আর মেয়াদ বাড়াতে চাননি। বিসিবিকে তাই নতুন প্রধান নির্বাচক খুঁজতে হয়। আগে নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করা হাবিবুল বাশারের দিকে হাত বাড়ায় বিসিবি। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশাররা নির্বাচক থাকার সময় জাতীয় দলে নিয়মিত ছিলেন মোসাদ্দেক। হয়তোবা তার পছন্দের অলরাউন্ডার। তাই হাবিবুল ফিরতেই তার কপালও ফেরে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দলে জায়গা দেওয়া হয় মোসাদ্দেককে।
সুযোগ পেয়েই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, অপেক্ষার চার বছর তাকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও পরিণত করেছে।
দলে ফেরা নিশ্চিতের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় অতীত মনে করিয়ে দিয়েছিলেন মোসাদ্দেক, ‘আমরা একসময় চারজন অলরাউন্ডার নিয়েও খেলেছি। দুজন একই ধাঁচের অলরাউন্ডার এক দলে খেলতে পারবে না, এটা কোনো নিয়ম না।’ তার কথায় ছিল আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ ও নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস।
গতকাল মিরপুরে তার ব্যাটিংয়ে দেখা গেছে সেই আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতি বুঝে খেলার ছাপ। শুরুতে উইকেট হারিয়ে চাপে থাকা বাংলাদেশকে টেনে তুলেছেন, শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন লড়াই করার মতো সংগ্রহে। পরে বল হাতেও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এনে দিয়েছেন। তার ব্যাটে এমন পারফরম্যান্স নির্বাচকদের সিদ্ধান্তের যথার্থতাই প্রমাণ করে।
মোসাদ্দেকের ইনিংসে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ২৮৪ রান করেছে। শুরুতে তানজিদ তামিমের ৪৪ বলে ৫৪ ও নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৬ বলে ৬৭ রানে বাংলাদেশের স্কোর বড় হয়। পরে নাহিদ রানার ৪ উইকেট এবং মোস্তাফিজুর ও মোসাদ্দেকের দুটি করে উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮৬ রানে জিতেছে বাংলাদেশ। ঠিক সেই ৮৬ রান যা মোসাদ্দেকের ব্যাট থেকে এসেছিল। অজিদের বিপক্ষে ওয়ানডেতে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়।
দলে ফিরে মোসাদ্দেক এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। তার চোখ ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে। বয়স, অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক ফর্ম— সব মিলিয়ে তিনি জানেন, এই সময় ও সুযোগটা তার ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামনে হয়তো আরও অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে— মোসাদ্দেক এখনো ফুরিয়ে যাননি।
বরং বলা যায়, দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট আবারও খুঁজে পেয়েছে এক লড়াকু অলরাউন্ডারকে; যিনি হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসার গল্প লিখতে জানেন।




