ব্যর্থতা বিতর্ক পেছনে ফেলে লিটনের সেঞ্চুরি

সংগৃহীত ছবি
ইয়ামিন আহমেদজাই'র বলটা একটু ভেতরে ঢুকেছিল, তারপর লিটন দাসের ব্যাটের কানায় লেগে গড়িয়ে গেল ডিপ থার্ডম্যান অঞ্চলের দিকে। দৌড়ে প্রান্ত বদল করে ব্যাট তুললেন লিটন। ৯৯ থেকে ১ রান নিয়ে সেঞ্চুরি নয়, ম্যাচে নিজের প্রথম রানটা করেই সতীর্থদের দিকে লিটনের ব্যাট তোলার অন্য একটা মানে আছে। সবশেষ ৫ ইনিংসে ৪ বারই যে আউট হয়েছেন ০ রানে, টেস্টে সবশেষ তিন ইনিংসেই ০। আবুধাবিতে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১ রান করার মাধ্যমে শূন্যের সেই ধারাবাহিকতায় বাঁধ দিলেন লিটন।
অস্ট্রেলিয়া সফর লিটনকে হতাশ করলেও আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়াম তাকে ভরিয়ে দিয়েছে কানায় কানায়। এশিয়ান গেমস খেলতে জাপানে গিয়ে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন লিটন, আফগানিস্তানের বিপক্ষে পারফরম্যান্স সেই আগুন জল ঢেলে নিভিয়েছে। প্রথম ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি, দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি, স্ট্যাম্পের পেছনে চমৎকার গ্লাভওয়ার্কে এখন পর্যন্ত ৮টা ডিসমিসাল; আবুধাবি টেস্টে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পারফর্মার নিঃসন্দেহে লিটন।
শরতের আকাশ কখনো নীল, কখনো ধূষর। এই রৌদ্র, এই মেঘ। লিটনের ক্যারিয়ারের সঙ্গে সবচেয়ে ভাল উপমা হিসেবে বোধহয় শরতের আকাশকেই মানায়। যখন ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন ব্যর্থতা যেন পিছুই ছাড়েনা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়টায় তাকে মনে হচ্ছিল ব্যাট হাতে দারুণ একটা বছর কাটবে, পরপর দুই ম্যাচে হাফসেঞ্চুরির পর পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি। কিন্তু শেষদিকে যেন রান করতেই ভুলে গেলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ৫ ইনিংসে রান করলেন যথাক্রমে ২, ৪, ০,০ এবং ৩! চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে জায়গা হারালেন। টি-টোয়েন্টিতে একটা দুটো ভাল ইনিংস খেলে ফের ওয়ানডে দলে এলেন, নিউজিল্যান্ড এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে কয়েকটা ভাল ইনিংসের দেখা পেলেন। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্টে এক ইনিংসে সেঞ্চুরি আর অন্য ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি, অথচ এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরে টানা ৩ ইনিংসে শূন্য!
এখানেই শেষ হলো না শূন্যের ধারাপাত, জাপানে এশিয়ান গেমস খেলতে এসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২ রানে আউট হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আবারও শূন্য। শরৎকালের রোদেলা আকাশটা মেঘে ঢেকে যেতে একদমই সময় নেয় না, তেমনি লিটনের ব্যাটিংও দা ভিঞ্চির মোনালিসা থেকে জয়নুলের দুর্ভিক্ষ হয়ে যায় চোখের পলকেই। আবার উল্টোটা হতেও সময় লাগে না, যেমনটা হল আবুধাবিতে।
টেস্ট ক্রিকেটে আফগানদের বোলিংয়ে সেই ধারটা নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আফগান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন তাদের রহস্য স্পিনাররা। রশিদ খান, মুজিব উর রহমান থেকে শুরু করে নুর আহমদ বা আল্লাহ মোহাম্মদ গজনফর; কেউই নেই তাদের টেস্ট দলে। তার উপর লিটন যখন ব্যাটিংয়ে নেমেছেন, তখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে রান হয়ে গেছে ২১২, লিড তিনশ ছাড়িয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের বোলিংকে আরো কোণঠাসা করেছেন লিটন ও মেহেদি হাসান মিরাজ।
ভাগ্যও ছিল পাশে। সকালে কায়েস আহমেদের বলে ক্যাচ পড়েছে স্লিপে, লিটনের রান তখন ১৪। এরপর ২৬ রানে থাকার সময় বোলারের হাতে সোজা তুলে দিয়েছিলেন, গতির প্রচণ্ডতায় বলটা হাতে রাখতে পারেননি কায়েস আহমেদ। এতো গেল ফিল্ডারদের ব্যর্থতা, ৬৭ রানের সময় ইয়ামিনের বল তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে জমা পড়লেও আম্পায়ার আউট দেননি। ওদিকে আফগানিস্তান রিভিউ শেষ করে ফেলেছে। নিলে নিশ্চিত আউট লিটন, অথচ বেঁচে গেলেন। একে সৌভাগ্য ছাড়া আর কি বলা যায়!
সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরিটা তাই লিটনের জন্য লাকি নাম্বার সেভেন নিঃসন্দেহে। ১১৭ বলে ১০২ রানের ইনিংস, ১৪টা বাউন্ডারি তবে কোন ছক্কা নেই। শেষটা উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে, তাতেই বাংলাদেশের অধিনায়কের ইনিংস ঘোষণার সংকেত। লিটনের সেঞ্চুরিতে আবুধাবিতে তার তিন সতীর্থের ৮০'র ঘরে আউট হওয়ার অতৃপ্তি ঘুচল, সেই সঙ্গে লিটনও হাঁসের খামারে সংখ্যা বাড়ানো থামালেন। তবে ম্যাচের প্রেক্ষাপটে লিটনের সেঞ্চুরি ৭-০ গোলে জেতা ম্যাচে শেষ দুই গোলের মত, ব্যবধান বাড়িয়ে স্কোরলাইনের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে তবে ফলে অবদান সামান্যই। বরং স্ট্যাম্পের পেছনেই লিটনের অবদানটা বেশি।



