ক্রিকেট ছাড়তে চাওয়া হাসানই এখন বাংলাদেশের গর্ব

শৈশবের কোচ মনির হোসনের সঙ্গে হাসান মাহমুদ। ছবি: মনির হোসেন
ডেমিয়েন ফ্লেমিং ডারউন টেস্টে হাসান মাহমুদকে দেখে মুগ্ধ রীতিমতো। একটি ইউটিউব চ্যানেলে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রার সামনেই বলেছিলেন,‘হাসানের মাঝে আমি ম্যাকগ্রার ছায়া দেখতে পাই।’
শুধু ফ্লেমিং নয়, সুইং আর নিখুঁত লেন্থে বল করে পুরো ক্রিকেট বিশ্বেরই হৃদয় কেড়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই পেসার। অথচ এই হাসানের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারত কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফোটার আগেই। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আর ক্রিকেট না খেলার ‘শপথ’ নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি!
সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতে মানসিক যন্ত্রণায় পুড়তে থাকেন আরও কয়েকবার। তখন পরম মমতায় হাসান মাহমুদের পাশে দাঁড়ান তার শৈশবের কোচ মনির হোসেন। ‘আগামীর সময়’-এর কাছে আজ তিনি তুলে ধরলেন হাসানের মানসিক যন্ত্রণার কথা,‘লক্ষীপুরে আমার একাডেমিতেই ২০১২ সালে ক্রিকেটে হাতে খড়ি হাসান মাহমুদের। তখন ও মাদ্রাসায় পড়ত। জেলা দলে খেলার সময় প্রথম বছরেই আমাদের আন্তঃজেলা চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে অবদান রেখেছিল হাসান। আমারই একটা ছেলে ৭ উইকেট পেয়েছিল। এক ম্যাচে। অথচ পরের ম্যাচে ওকে বসিয়ে আমি হাসানকে খেলাই। কম রান দিয়ে টুর্নামেন্টে ৮ উইকেট নিয়ে আমার আস্থার প্রতিদান দিয়েছিল হাসান।’
তবে হাসানের মানসিক ধাক্কা খাওয়ার ব্যাপারটা জানিয়ে মনির হোসেন বললেন,‘এরপর থেকে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগীয় দল থেকে ডাক পায় অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলের ক্যাম্পে। এটা আমাদের জন্য গর্বের। কিন্তু বিস্ময়করভাবে হাসানকে বাদ দেওয়া হয় চট্টগ্রাম অনূর্ধ্ব-১৬ দল থেকে! এরপর ভেঙে পড়েছিল ও। জাতীয় পর্যায়ে খেলা একজন বিভাগীয় দল থেকে বাদ পড়ে কীভাবে? এই মানসিক যন্ত্রণায় ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল হাসান।’
শুরুতে মনির হোসেন ভেবেছিলেন এটা ছোট্ট একটা বাচ্চার অভিমানী সিদ্ধান্ত। কিন্তু কয়েক দিন কেটে গেলেও হাসান আর মাঠে আসেন না। দেখতে দেখতে কেটে যায় ৪ মাস, হাসানের খোঁজ নেই। মনির হোসেন বারবার তার বাড়ি গিয়ে বুঝিয়েছেন, এমনকি হাসানের বাবা-মাও বুঝিয়েছেন-তাতেও কাজ হয়নি।
এ নিয়ে মনির হোসেন বললেন,‘আমার কথা, ওর বন্ধু এমনকি বাবা-মায়ের কথাতেও মাঠে আসছিল না হাসান। এমন প্রতিভাবান একজনকে হারাতে চাইনি আমি। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টায় অভিমান ভাঙ্গিয়ে তাকে মাঠে ফেরাই। একদিন ওর বাবা আমার অফিসে এসে ৫০০ টাকা দিয়ে বলেছিল, স্যার এই টাকা দিয়ে মিষ্টি কিনে সবাইকে খাওয়াবেন। ছেলেটাকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব আপনার।’
মনিরের হাত ধরে অনূর্ধ-১৭ জাতীয় দলে সুযোগ পান হাসান। কিন্তু কক্সবাজারে ভারতের বিপক্ষে ডাক পাননি শুরুতে। একজনের ইনজুরিতে দলে ফেরার স্মৃতিচারণ করে মনির বললেন,‘সেবার প্লেনে করে ওকে পাঠানো হয় কক্সবাজারে। সেটাই ওর জীবনের প্রথম প্লেনে চড়া। সেই ম্যাচে ১৮ ওভারে ১৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে নিজের জাত চেনায় ও।’
২০১৮ সালের ইমার্জিং টিমস এশিয়া কাপের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল হাসানকে। এই পেসার তখন সিদ্ধান্ত নেন, ক্রিকেটে যথেষ্ট হয়েছে এখন ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভালো একটা চাকরির চেষ্টা করা যাক! সেই অভিমানও ভাঙান মনির হোসেন। ২০১৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের আগে এক স্থানীয় ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময় কাঁধে চোট পেলে আবারও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন হাসান মাহমুদ। তবে চোট কাটিয়ে ফিরে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ৯ উইকেট পান তিনি।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা হাসান মাহমুদ পেয়েছিলেন কোভিডের সময়। তখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তার সতীর্থরা জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছিলেন। আর হাসান পড়েছিলেন পিঠের দীর্ঘস্থায়ী ইনজুরিতে। বাংলাদেশের চিকিৎসকেরাও শনাক্ত করতে পারছিলেন না, সমস্যাটা কোথায়? হাসান তখন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন তার ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ!
মনির হোসেন আগামীর সময়কে হাসানের মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বললেন,‘আঘাত সহ্য করতে করতে বেশ পরিণত হয়ে গিয়েছিল হাসান। কিন্তু লম্বা ইনজুরিতে কারও হাত ছিল না। দেশেও চিকিৎসা হচ্ছিল না। স্বপ্ন শেষের যন্ত্রণায় পুড়ছিল হাসান। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ও। আমার ফোনও ধরত না। ভারতে পাঠিয়ে চিকিৎসা করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমি। চিকিৎসার জন্য ৪ লাখ টাকাও দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নেয়নি ও। পরে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ভাইকে অনুরোধ করি ওর চিকিৎসা যেন বিসিবি থেকে করা হয়। বিসিবি পরে ভারত আর ইংল্যান্ডে পাঠায় হাসানকে। তারপরও সমস্যাটা কাটছিল না। অবশেষে বিসিবির রিহ্যাবের পর সুস্থ হয়ে উঠে হাসান। সে এখন শুধু লক্ষীপুর নয় পুরো দেশেরই গর্ব।’
হাসান কোন সমস্যায় পড়লে বা উন্নতি করতে চাইলে এখনও পরামর্শ চান মনির হোসেনের। এ নিয়ে মনির বললেন,‘আমাদের প্রায়ই কথা হয়। একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১০ ওভারে ৫৩ রানে ১ উইকেট নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছিল ও। তখন বলেছিলাম, মানুষ কিন্তু উইকেট আর রানের সংখ্যাটাই দেখে। মাঝে ২০-২৫টা বল ভালো করেছো সেটা দেখে না। এরপর ভালো করার ক্ষুধা আরও বাড়ে ওর। আরেকবার নিউজিল্যান্ডে এক ওভারে বেশি রান দিয়ে ফেলেছিল। তখন বলেছিলাম হতাশ না হয়ে নিজের স্টক ডেলিভারিতে ভরসা রাখতে। ওর স্টক ডেলিভারি খেলা বিশ্বের যে কারও পক্ষেই কঠিন। এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে সেটা আরও একবার প্রমাণ করল হাসান।’






