টেন্ডুলকারকে ছাড়িয়ে যেতে কোহলির বড় বাধা কি তার ‘উগ্র মেজাজ’?

ভারতীয় ক্রিকেটের দুই কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলি।
বেঙ্গালুরুতে সম্প্রতি আয়োজিত ‘আরসিবি ইনোভেশন ল্যাব ইন্ডিয়ান স্পোর্টস সামিট’-এ অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন বিরাট কোহলি। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক আলাপচারিতায় ক্যারিয়ারের ১৮ বছরের শিক্ষা এবং জীবন নিয়ে নিজের গভীর দর্শনের কথা বলছিলেন তিনি। কোহলি বলছিলেন, এখন তিনি কোনো ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, বরং ক্রিকেটের চেয়েও ‘বড় কোনো উদ্দেশ্যে’র জন্য খেলেন। নেতিবাচক চিন্তা দূরে ঠেলে দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা যখন তিনি বলছিলেন, তখন হলভর্তি দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনছিল।
এর ঠিক দুদিন পরই হায়দরাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে দেখা গেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কোহলিকে। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের কাছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর ৫৫ রানের বড় ব্যবধানে হারের পর মাঠের ভেতরের এক ঘটনা এখন ক্রিকেটবিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে। করমর্দনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেডের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যান কোহলি। মাঠের অন্য সবার সঙ্গে হাত মেলালেও হেডকে এক প্রকার বিব্রত করেই পাশ কাটিয়ে যান তিনি। ৩৭ পেরিয়ে ৩৮-এ পা দেওয়া কোহলির এই অতি-আগ্রাসী রূপ ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে নতুন এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মাঠে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোহলির সম্পর্ক দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বেশ অম্লমধুর। কখনো গ্যালারির দিকে অশোভন ইঙ্গিত, কখনো বা স্টিভ স্মিথের ঘটনার পর ‘অজিদের সঙ্গে আর বন্ধুত্ব নয়’ বলে হুঙ্কার—সবই উপহার দিয়েছেন তিনি। আবার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল বা জশ হ্যাজেলউডের মতো অজি ক্রিকেটারদের সঙ্গে তার দারুণ বন্ধুত্বের নজিরও আছে।
তবে ট্রাভিস হেড যেন কোহলির জন্য এক ‘অস্পৃশ্য’ ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ম্যাচ চলাকালীন কোহলি যখন প্যাট কামিন্সকে ফাইন-লেগ দিয়ে চার মারেন, তখন হেড কামিন্সকে ইঙ্গিত করেন কোহলিকে আউট করার জন্য ফাঁদ পাততে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কোহলি হেডকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সাহস থাকলে তুমি নিজে এসে বল কর।’ পরবর্তীতে কোহলি যখন সাকিব হুসাইনের বলে আউট হন, তখন হেড কোহলির কানের কাছে গিয়ে টিপ্পনী কেটে বলেন, ‘তুমি তো আমার অফ-স্পিন দেখার জন্যও ক্রিজে টিকলে না!’ মাঠের এই স্লেজিং ও নাটকীয়তা স্বাভাবিক মনে হলেও, ম্যাচ শেষে হ্যান্ডশেক না করার বিষয়টি কোহলির মতো কিংবদন্তির ক্রিকেটীয় সৌজন্যবোধকে বড়সড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বিরাট কোহলির সঙ্গে ভারতের সর্বকালের সেরা ব্যাটার শচীন টেন্ডুলকারের তুলনা করে আসছেন। ওয়ানডে সেঞ্চুরির সংখ্যায় শচীনকে ছাড়িয়ে গেলেও টেস্ট গড় বা অন্যান্য প্রায় সব প্যারামিটারেই শচীন এখনো কোহলির চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। তবে রান বা শতকের চেয়েও যে বিষয়টি শচীনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা হলো তার ২৪ বছরের ক্যারিয়ারের অবিশ্বাস্য সংযম।
দুই যুগের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শচীন টেন্ডুলকারকে মাঠের ভেতরে কখনো মেজাজ হারাতে বা কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে নোংরা বাক্যবিনিময়ে জড়াতে দেখা যায়নি বললেই চলে। ২০০০ সালের আইসিসি নকআউট ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা স্লেজিং করার পর শচীন যখন তাকে মুখ সামলে কথা বলতে বলেছিলেন, তখন ম্যাকগ্রা নিজেই বিস্ময়ে কানে হাত দিয়েছিলেন। কারণ শচীনের মুখ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া কেউ আশাই করেনি। শচীন ছিলেন বিশ্বক্রিকেটে ভারতের এক বিস্ময়কর 'ভদ্রলোক'। ১৬ বছর বয়সী কোঁকড়া চুলের এক কিশোর থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির রোল মডেল।
কোহলি ও টেন্ডুলকার—দুজনেই ক্যারিয়ারে তুমুল চাপ সামলেছেন, সাফল্যের এভারেস্টে চড়েছেন, আবার ফর্মের তলানিতেও নেমেছেন। দুজনেই কোটি মানুষের আইকন। তবে দিনশেষে শচীন টেন্ডুলকার ২৪ বছর ধরে মাঠে যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, যে গাম্ভীর্য ও মর্যাদা বজায় রেখেছেন, তা ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কোহলি তার অবিশ্বাস্য ফিটনেস, নিবেদন ও রান তোলার ক্ষুধা দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সত্যি; কিন্তু মাঠের ভেতরে মাঝেমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা এই উগ্র মেজাজ শচীনের সেই ‘সবুজ রূপকথা’র পাশে কোহলিকে বসাতে দ্বিধায় ফেলছে খোদভারতীয় সমর্থকদেরই। মাঠের আগ্রাসনকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে জানা কোহলি যদি এই বয়সে এসেও সৌজন্যবোধের ঘাটতি দেখান, তবে সর্বকালের সেরার তালিকায় শচীনের সমকক্ষ হওয়া তার জন্য সত্যিই কঠিন হবে।






