নাহিদ রানা ১৫২ কিমি/ঘণ্টা

১৬১.০ লেখা বোর্ডের পাশে বসা শোয়েব আখতার। নিশ্চয়ই অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর চোখে পড়েছে ছবিটি। তবে এটি বানানো ছবি, সত্যি নয়। সত্যি হলো, শোয়েবের বলের গতি। ২০০৩ বিশ্বকাপে তিনি বল করেছিলেন ১৬১.৩ কিলোমিটার বেগে! এটি রেকর্ড। এর আগে থেকেই ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ গতির ঝড় তুলতেন ১৫০ কিলোমিটার বেগে। মানুষের কেন যেন স্পিনের মায়াবী সৌন্দর্যের চেয়ে গতির দিকেই ঝোঁক বেশি। হয়তোবা গতির ঝড়ে সব তছনছ করে দেওয়ার অহম থাকে বলে।
এ কারণেই কি না বাংলাদেশের মানুষও শোয়েব আখতারের মতো এক স্পিডস্টারের স্বপ্ন দেখতে থাকে। যার হাত ধরে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে দেশের ক্রিকেট। ২০০১ সালে ওই স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছে যান মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। শোয়েবের আদলে তার নাম হয় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। তবে দেড়শ ছুঁতে পারেননি তিনি। মাশরাফীর পর তাসকিন গিয়েছিলেন আরও কাছে। ১৪৯.৫৬ বেগে বল করেছিলেন ২০২২-এ। তবুও ১৫০ অধরাই থাকে।
রূপকথার গল্পের নায়কের মতো হঠাৎ আবির্ভাব হয় নাহিদ রানার। ছেলেটা জোরে বল করতে পারে। কত জোরে? ১৪৫ কিমিতে অনেকেই করে। ১৫০ কি পারবে? ২০২৪-এ পাকিস্তান টেস্ট সিরিজ শোয়েবের শহর রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়েই ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটারে ঝড় তোলেন। রানার হাতে বাংলাদেশ ছুঁলো ১৫০! এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের গতির গর্ব। এখন রানার প্রশংসায় পঞ্চমুখ বিশ্বক্রিকেট। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেকেই ১৫০-এ বল ছুড়বে, কিন্তু প্রথম হওয়ার ঐতিহাসিক ব্যাপারটা আলাদা। ইতিহাসেরও পরম্পরা থাকে। গতির মশালটা কারা জ্বেলেছিলেন, কাদের হাত ঘুরে রানার কাছে এসেছে, তাও একটা ব্যাপার।
প্রিন্সকে দিয়ে শুরু
১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলে। তখন ক্রিকেট মৌসুম ছিল মাত্র চার মাস। ছিল না পর্যাপ্ত অনুশীলন সুবিধা-পিচ-মাঠ, বোলিং কোচ, দামি কেডস। সবই ছিল অলীক স্বপ্ন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৮৬-তে প্রায় ১৩৫ কিমি/ঘণ্টার গতির পেসার ছিল দেশের ক্রিকেটে। সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ লিপুর বিশ্লেষণে গোলাম নওশের প্রিন্সকে দিয়েই জোরে বোলিংয়ের ইতিহাস শুরু, ‘তখন প্রিন্স সবচেয়ে জোরে বল করত। জিয়াউল ইসলাম মাসুদ ছিল, তার আগে দৌলত ভাইও ছিলেন। কিন্তু প্রিন্সের গতিই বেশি ছিল। অনুমান করে বলতে হলে ১৩৫-এর কাছাকাছি থাকত তার গতি। কিছু ডেলিভারি আবার এর চেয়েও জোরে আসত। এখনকার সুযোগ-সুবিধাগুলো পেলে ওর গতি ১৪৫-এ পৌঁছাত। প্রিন্স একবার ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়েছিল, এরপর থেকেই তার বোলিংয়ের গতি বেড়ে যায়।’
প্রিন্স ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়েছিলেন ১৯৮৪-তে। আর ওখানে শিখেছিলেন গতি বাড়ানো, সুইং করানো, টানা বোলিং করার কৌশল এবং বোলিংয়ে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রিন্স বলেছেন, ‘আমার বলের গতি সবসময় ১৩০-এর ওপর থাকত, লিপু ভাই যা বলেছেন তাই হয়তো হবে। যারা দেখেছেন তারাই সঠিক বলতে পারবেন।’
প্রিন্সের সময় ছিল না স্পিডোমিটার। হাসিবুল হোসেন শান্তও ছিলেন সেই যুগের ফাস্ট বোলার। তার স্মৃতিতে আছে ১৩৮ কিমি গতির কথা, ‘যতটুকু মনে পড়ে, আমি ১৩৮ কিমিতে বল করতাম। আমার সেরা সময় ছিল ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিতে। খুব সম্ভবত কেনিয়ার সঙ্গেই সবচেয়ে জোরে বল করেছিলাম। টেস্ট স্ট্যাটাসের আগে নিউজিল্যান্ড সফরেও আমার বলে ভালো গতি ছিল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও ভালো পেসে বল করেছি।’
স্পিডোমিটার যুগে
এরপর ক্রিকেটে স্পিডোমিটার যোগ হওয়ায় বোলারদের গতি সহজেই দেখা যেত। ওই সময় মাশরাফী ছুটেছেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ হয়ে। তার অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার। তিনি স্লিপে দাঁড়িয়ে মাশরাফীর গতি উপভোগ করতেন, ‘মাশরাফী প্রথম দিকে দুর্দান্ত পেস বোলিং করত, জেনুইন কুইক। আমি স্লিপে দাঁড়াতাম। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে, যদি বলতে হয় তার প্রতিটি বল ছিল ১৪০-এর ওপর। নিউজিল্যান্ডে প্রথম সফরেও সে ১৪০ কিমি গতিতে বল করেছিল।’
মাশরাফীর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে। সে বছরই নিউজিল্যান্ডের হ্যামিলটন টেস্টে নাথান অ্যাস্টলকে করা একটি বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪৮.১ কিলোমিটার। কিন্তু ২০০৩ সালে হাঁটুর অস্ত্রোপচারে গতি শ্লথ হয়ে যায়। হাবিবুল যেভাবে বলেছেন, ‘মাশরাফীর সমস্যা ছিল ইনজুরি। সার্জারির পর ওকে অন্যভাবে তৈরি হতে হয়েছে। ও দারুণ বুদ্ধিমান বোলার, কন্ডিশন ব্যবহার করতে পারত। যখন দেখেছে পেসটা কমে গেছে, তখন সুইং নিয়ে কাজ করল। ওদিকটায় উন্নতি করেছিল।’
শুধু মাশরাফী নন, দেশের আরেক পেসার শাহাদাত হোসেন রাজিবকে নিয়েও প্রধান নির্বাচক বলেছেন, ‘শাহাদাত একটু ভিন্নরকম পেসার ছিল, ওর গতির সঙ্গে বাউন্স ছিল বেশি, কারণ সে বেশ লম্বা। সেও ১৪০-এর ওপর বল করত। তার কিন্তু কন্ডিশন প্রয়োজন হতো।’ ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ২৭ রানে ৬ উইকেট নেওয়ার সময় রাজিব বল করেছিলেন ১৪৮ কিমিতে।
রানা-তাসকিনে গতির ইতিহাস
বাংলাদেশের ফাস্ট বোলারের ইতিহাসে থাকবেন সদ্য অবসরে যাওয়া রুবেল হোসেনও। এখন তার উত্তরসূরিরাই গতির ঝড় তুলছেন। তবে তাসকিন আহমেদ গিয়েছিলেন ১৫০-এর খুব কাছাকাছি। ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কুইন্টন ডি কককে করা একটি ডেলিভারিতে তিনি ঘণ্টায় ১৪৯.৫৬ কিলোমিটার গতি স্পর্শ করেছিলেন। নাহিদ রানার আগুনে গোলা ছোড়ার আগপর্যন্ত এটিই ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি বোলারের দ্রুততম ডেলিভারি। এরপর নাহিদ রানার হাতেই তৈরি হয়েছে দেশের ফাস্ট বোলিংয়ে নতুন ইতিহাস। শোয়েব আখতারের শহরে বল করেছিলেন ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটার গতিতে।
একসময় অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান দলে ভয়ংকর পেসারদের ছিল লম্বা তালিকা। কিছুদিন আগে থেকে ভারতও হাঁটছে সেই পথে। এখন পাকিস্তানের পিএসএল ফাইনালিস্ট দলও অপেক্ষায় থাকে বাংলাদেশি ফাস্ট বোলারের জন্য। তারা ভরসা খুঁজে পেয়েছিল নাহিদ রানার গতিতে। এ গতি তারকা নিখুঁত লাইন-লেন্থে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বোলিং করে ব্যাটারদের হৃৎকম্প বাড়িয়ে বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটকে নিয়ে গেছেন এলিট কোটায়।







