বাংলাদেশের সমস্যা ব্যাটিংয়ে
বোলারদের জন্য অনেক আয়োজন, ব্যাটারদের জন্য কিছুই নেই

অস্ট্রেলিয়ায় তিন ইনিংস ব্যাট করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি লিটন
ডারউইনে গর্বের পাশাপাশি ম্যাকাইতে জুটেছে লজ্জাও। অস্ট্রেলিয়া সফরে একটি তিন দিনের ম্যাচ ও দুই টেস্ট মিলিয়ে ছয় ইনিংস ব্যাটিং করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, এর ভেতর তিন ইনিংসেই বাংলাদেশ অলআউট হয়েছে ১০০ রানের নিচে। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের দুই পেসার হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের সাফল্য পেস বোলিং নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্যোগের প্রমাণ। অন্যদিকে ব্যাটিং ব্যর্থতা ফের প্রশ্নবিদ্ধ করল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্যকেই।
পেস বোলিংয়ে উন্নতি যেভাবে
বছর দশেক আগেও, টেস্টে বাংলাদেশ দলের বোলিং আক্রমণ মানে ছিল বামহাতি স্পিনারের আধিপত্য। পেস বোলারের ভূমিকা অনেকটাই আলংকারিক, যেটা অধিনায়ক হিসেবে সাকিব আল হাসান একটা পর্যায়ে ছেঁটেই ফেলেছিলেন। সেই খাদের কিনারা থেকে পেসাররাই এখন বিদেশে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের প্রধান অস্ত্র। গত দুই বছরে দুবার বাংলাদেশের পেসাররা মিলেই এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের ১০ উইকেট তুলে নিয়েছেন, ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে আর ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ডারউইনে।
হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ডারউইন জয়
এ সাফল্য আচমকা আসেনি, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডিউক বলের ব্যবহার, উইকেটে ঘাস রাখা, সাবেক গতিতারকা যেমন অ্যালান ডোনাল্ড, শন টেইটের মতো ক্রিকেটারদের পেস বোলিং কোচ হিসেবে দলের সঙ্গে যুক্ত করাসহ অনেক উদ্যোগই নিয়েছে বিসিবি। গতিতারকা খুঁজতে হয়েছে পেসার হান্ট, হাইপারফরম্যান্স দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে বিশেষ অনুশীলন ক্যাম্প করেছিলেন আকিব জাভেদ। পেস বোলারের খোঁজে এমন অনেক উদ্যোগই সময়ে সময়ে নিয়েছে বিসিবি।
লেগ স্পিনের জন্যও বিশেষ উদ্যোগ
লেগ স্পিনারের সন্ধানে পাকিস্তানের শাহেদ মেহমুদকে দিয়ে ট্যালেন্ট হান্ট করিয়েছে বিসিবি, তিনি জেলায় জেলায় ঘুরে সন্ধান করেছেন রিস্ট স্পিনারের। রিশাদ হোসেনকেও গড়ে তোলার পেছনে বিসিবির ভূমিকা কম নয়। জাতীয় দলেও কাজ করছেন পাকিস্তানের সাবেক লেগ স্পিনার মুশতাক আহমেদ। তার সান্নিধ্যে রিশাদ হোসেন হয়ে উঠেছেন পরিণত, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে রিশাদ ডাক পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ আর দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০ লিগেও।
লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন
বাংলাদেশের পেস বোলারদের সুযোগ হচ্ছে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটেও। হাসান মাহমুদ কেন্টের হয়ে অভিষেকেই চমক দেখিয়েছেন, তার দেখানো পথে যাচ্ছেন খালেদ আহমেদও। ক্রিকেট দক্ষতার যে দুটি বিভাগ একটা সময় ছিল ঘাটতি বা দুর্বলতার জায়গা, সেসবই এখন বাংলাদেশের শক্তি। অথচ ক্রিকেটের সবচেয়ে মৌলিক পাঠ, ব্যাটিং নিয়ে এখনো দুর্বলতা স্পষ্ট।
ব্যাটারদের জন্য কিছুই নেই
নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। অবাক করা তথ্য হচ্ছে, আশরাফুলের আগে অন্তত এমন তিনজন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন, যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটই কখনো খেলেননি! ইংল্যান্ডের জন লুইস, বারমুডার ডেভিড হেম্প; এই দুজন তাও খেলোয়াড়ি জীবনে ব্যাটসম্যান ছিলেন, ২০২৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে কাজ করা সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন মিডিয়াম পেসার। আশরাফুলের জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল এবং পরীক্ষিত ব্যাটসম্যান হচ্ছেন অ্যাশওয়েল প্রিন্স। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৬৬ টেস্ট খেলা প্রিন্স এক বছরের কিছু কম সময়ে ছিলেন দায়িত্বে, এরপর ২০২২ সালের শুরুর দিকেই তিনি বাংলাদেশের চাকরি ছেড়ে এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং কোচের দায়িত্বে। ২০২৫ সালে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে প্রোটিয়ারা।
আশরাফুল কী বলছেন
আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপে আশরাফুল জানালেন, ব্যাটিংয়ে উন্নতির জন্য শুধু জাতীয় দলে নয়, নিচের স্তরগুলোতেও দরকার বিশেষজ্ঞ ব্যাটিং কোচ, ‘বিশেষজ্ঞ ব্যাটিং কোচ আসলে নিচের দিকে অর্থাৎ বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে এবং এরপর যেমন এইচপি পর্যায়েই বেশি দরকার। কারণ, ছোটবেলা থেকে কেউ যদি ভুলভাবে কোনো কিছু শিখে আসে, তাহলে জাতীয় দলে সেটা সংশোধন করা কঠিন। এলিট লেভেলে শুধু ম্যান ম্যানেজমেন্ট আর সঠিক ফ্যাসিলিটি নিশ্চিত করতে হবে।’
কথা বলছেন বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল
বাংলাদেশের সাবেক এ অধিনায়ক বললেন, ভালো ব্যাটসম্যান হতে গেলে বেশি বেশি খেলার কোনো বিকল্প নেই, ‘আমাদের দেশে একজন ব্যাটসম্যান এক মৌসুমে কয়টা ম্যাচ খেলে? ৭টি চার দিনের ম্যাচ, প্রিমিয়ার লিগে ১১ থেকে ১৬টি ম্যাচ আর বিপিএলে ১২-১৩টি ম্যাচ। এত কম খেলে আসলে ভালো ব্যাটসম্যান হওয়া যায় না। ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলা হয় ছয় মাস। এ ছয় মাসে একজন ব্যাটসম্যান ১৪টি চার দিনের ম্যাচ খেলে, ৫০ ওভারের টুর্নামেন্টে ১২টি ম্যাচ খেলে, এরপর টি-টোয়েন্টি আছে, দ্য হান্ড্রেড আছে। সপ্তাহে সপ্তাহে খেললে যেটি হবে, প্রথম সপ্তাহে কেউ ফেল করবে, দ্বিতীয় সপ্তাহেও ফেল করবে কিন্তু এরপর তৃতীয় সপ্তাহে গিয়ে হয়তো ভালো করবে।’
আসছে কোকাবুরা ও এসজি বল
ব্যাটসম্যানদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিসিবির কি কোনো উদ্যোগ নেই? এমন প্রশ্নে বিসিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বোলার হচ্ছে হীরার মতো, খনি থেকে তুলে এনে পলিশ করলেই হয়। ব্যাটসম্যান হচ্ছে সোনার মতো, পুড়তে পুড়তে খাঁটি হবে। ব্যাটসম্যানদের নিজেদেরও আসলে পরিশ্রম করতে হবে। দিনশেষে ব্যাটিংটা কিন্তু কঠিন, কারণ আউট হতে একটি বলই যথেষ্ট।
তার কাছ থেকেই জানা গেল, বিসিবি ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের জীবন খানিকটা সহজ করতে যাচ্ছে! ২০২২-২৩ মৌসুম থেকে জাতীয় লিগে ডিউক বল দিয়ে খেলা হতো, যা ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে ব্যবহৃত হয়। মোটা সেলাই ও লম্বা সময় বলের উজ্জ্বলতা টিকে থাকায় এই বলে পেসাররা একটু সুবিধা পেতেন। আসছে মৌসুম থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটে কোকাবুরা ও এসজি বল ব্যবহার করা হবে। এতে ব্যাটসম্যানদের জন্য রান করাটা একটু সহজ হয়তো হবে, তবে বেশি সহজ যেন না হয়, সেজন্য উইকেটে ঘাসের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে রাখার পরিকল্পনাও আছে।
অবশ্য পরিকল্পনা অনেক হয়, এখন যেমন বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটি পরিকল্পনা করছে জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টি, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের চার দিনের ম্যাচ ও এক দিনের ম্যাচের প্রতিযোগিতা, সবকিছুকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসে বাংলাদেশ ফার্স্ট নামের নতুন একটা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট চালু করতে। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ঘোষণা দিয়েছেন, কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে জাতীয় লিগের সব বিভাগীয় দলের মূল দলের পাশাপাশি সেকেন্ড ইলেভেন বা দ্বিতীয় একাদশ চালু করার, তবে ২২ গজে বোলার আর ১০ জন ফিল্ডারের ঘেরাওয়ের মাঝে একজন ব্যাটসম্যান যেমন একা, তেমনি অনুশীলনের জন্যও শুধু বিসিবির ওপর ভরসা না করে থাকতে হবে নিজস্ব উদ্যোগও— এমনটাই বললেন জাতীয় দলের এক সাবেক অধিনায়ক।










