গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ধারণা কার্যকর থাকবে না

উন্নত দেশগুলোতে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ নেই। আমাদের বর্তমান পাঁচমিশালি হাইব্রিড গণমাধ্যম কাঠামোয় তার চর্চা সম্ভব না হলেও একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে এ দেশের গণমাধ্যমকে বিশ্বাসযোগ্য স্তম্ভে রূপান্তরের পথটা প্রশস্ত করা সম্ভব, যাতে আখেরে দেশের সরকার ও রাজনীতিই উপকৃত হবে
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন এক গণপরিসরের দায়িত্ব নিয়েছে, যা ভঙ্গুর, অবিশ্বাসে আক্রান্ত এবং ভুল তথ্যের চাপে বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষা, কৌশলগত যোগাযোগের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা এবং গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে হলে সরকারকে অতীতের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি একক, একীভূত ও প্রকৃত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হলে গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্য স্তম্ভে রূপান্তর করা সম্ভব।
আধুনিক গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল শিক্ষা হলো রাষ্ট্রকে সরাসরি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত বা লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণের জায়গায় থাকা চলবে না। এই নীতিকে বলা যায় ‘দূরত্ব বজায় রেখে নিয়ন্ত্রণ’ বা আর্মস লেন্থ নীতি।
যুক্তরাজ্যের অফকম এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে টেলিযোগাযোগ, সম্প্রচার ও অনলাইন নিরাপত্তা একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এসেছে। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা কমেছে এবং আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখতিয়ারগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি। নরওয়ের মেদিয়েতিলসিনেত বা নরওয়েজিয়ান মিডিয়া অথরিটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল। সেখানে গণমাধ্যমে সরকারি সহায়তা দেওয়া হলেও তা স্বাধীন উপদেষ্টা কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর ফলে সংখ্যালঘু কণ্ঠ, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং ছোট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দলীয় বিবেচনার বাইরে থেকে সহায়তা পায়। সুইডেনের অভিজ্ঞতা আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বার্তা দেয়। সেখানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত। অর্থায়ন ব্যবস্থায় এমন দূরত্ব রাখা হয়, যাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বাণিজ্যিক চাপ— কোনোটিই গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে না পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, এখানে গণমাধ্যম শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নয়; করপোরেট স্বার্থের চাপেও দুর্বল হয়।
তবে পশ্চিমা মডেল সরাসরি কপি করলেই বাংলাদেশে সমাধান মিলবে না। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বাস্তবতা জটিল ও মিশ্র। এখানে পেশাদার জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতা, বাণিজ্যিক বিনোদন, করপোরেট মালিকানা, স্থানীয় রাজনৈতিক পোর্টাল এবং নাগরিক লাইভ স্ট্রিমিং—সব মিলেমিশে এক ধরনের হাইব্রিড গণমাধ্যম কাঠামো তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা না বুঝলে কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো কার্যকর হবে না।
প্রথমত, বাংলাদেশের মূলধারার প্রিন্ট ও সম্প্রচার মাধ্যমের বড় অংশ বহু খাতভিত্তিক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানায়। এসব মালিক অনেক সময় গণমাধ্যমকে জনস্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নিজেদের বৃহত্তর ব্যবসায়িক স্বার্থের সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সংবাদকক্ষের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি হয় এবং সাংবাদিকতা দুর্বল হয়।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রকাশনার খরচ কম হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল গড়ে উঠেছে। স্থানীয় রাজনীতিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গুজব ছড়ায়, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে এবং নিজস্ব রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ায়।
সরকার সরাসরি গণমাধ্যমকে শাস্তি দিলে তা রাজনৈতিক সেন্সরশিপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একটি স্বাধীন কমিশন পেশাগত আচরণবিধির ভিত্তিতে অভিযোগ নিষ্পত্তি করলে সেটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে
তৃতীয়ত, স্মার্টফোন ও ৪জি ইন্টারনেট নাগরিক লাইভ স্ট্রিমারের এক বিশাল জগৎ তৈরি করেছে। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে অনেকেই সংবাদকক্ষের কোনো পেশাদার যাচাই ছাড়াই ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি তথ্য প্রচার করেন। এতে তথ্য দ্রুত ছড়ায়; কিন্তু যাচাইহীনতা, আবেগি ভাষা, অতিরঞ্জন ও গুজবের ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক সময় এই কনটেন্ট পেশাদার সাংবাদিকতার চেয়ে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পুরনো ধারণা আর কার্যকর থাকে না।
একটি বিশ্বাসযোগ্য কমিশন গঠনের প্রথম শর্ত হলো কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছতা। কমিশনে একজন চেয়ারম্যানসহ ৯ জন সদস্য থাকতে পারে। তবে এই সদস্যদের সরাসরি সরকারের পছন্দে নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই আস্থাহীন হয়ে পড়বে। তাই রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, বহু অংশীজনভিত্তিক সার্চ কমিটি গঠন করে কমিশনার নিয়োগ দেওয়া উচিত।
এই সার্চ কমিটিতে সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম বিষয়ে অভিজ্ঞ অ্যাকাডেমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। কমিশনে নারী ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কারণ, গণমাধ্যম স্বাধীনতা শুধু বড় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন নয়; এটি প্রান্তিক কণ্ঠের সুরক্ষার প্রশ্নও। কমিশনারদের মেয়াদ একবারের জন্য চার বছর নির্ধারণ করা যেতে পারে। তাদের অপসারণ শুধু প্রমাণিত শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। এতে রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় কমবে।
কমিশনের কাজও স্পষ্টভাবে সীমিত করতে হবে। এর কাজ হবে পেশাগত আচরণবিধি প্রয়োগ, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া পরিচালনা। তথ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে লাইসেন্স বা নিবন্ধন রাখলে তা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সম্প্রচার ও ডিজিটাল নিবন্ধনের ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকা উচিত।
কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বরাদ্দের ওপর কমিশন নির্ভর করলে সরকার বাজেটের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। তাই কমিশনের জন্য বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো দরকার। বাণিজ্যিক টেলিভিশন, বড় টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এবং বড় ডিজিটাল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়ের ওপর সামান্য নিয়ন্ত্রক ফি আরোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে রেডিও স্পেকট্রাম লাইসেন্সিং থেকে পাওয়া ফির একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশনের জন্য রাখা যেতে পারে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে।
যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার স্বেচ্ছায় নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের পুরনো হাতিয়ার ছেড়ে একটি স্বাধীন কমিশনকে ক্ষমতা দেয়, তাহলে তা বড় রাজনৈতিক বার্তা দেবে। এতে বোঝা যাবে, সরকার সমালোচনা নিয়ন্ত্রণ করতে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান গড়তে আগ্রহী। এটি দেশীয় নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আস্থার সংকেত হতে পারে।
ভুয়া খবর মোকাবিলার ক্ষেত্রেও স্বাধীন কমিশন জরুরি। সরকার সরাসরি কোনো গণমাধ্যমকে শাস্তি দিলে তা সহজেই রাজনৈতিক সেন্সরশিপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একটি স্বাধীন কমিশন যদি পেশাগত আচরণবিধির ভিত্তিতে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে, তাহলে সেটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি জুলাই-আগস্ট ২০২৬ সময়সীমার মধ্যে সমন্বিত গণমাধ্যম নীতি প্রণয়নের কথা বলেছেন। এই সময়সীমা সামনে রেখে সরকার চাইলে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে। স্বৈরশাসন-পরবর্তী কোনো সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা হলো, তারা কত শক্ত হাতে ভিন্নমত দমন করতে পারে, তা নয়; বরং তারা কত সাহসের সঙ্গে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে, সেটিই আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশে একটি একক, একীভূত, আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা গেলে গণমাধ্যমকে দলীয় সংঘাতের অস্ত্র থেকে জনআস্থার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।
সেই সঙ্গে বর্তমান সরকারকে তথ্য কমিশনের পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। সম্ভবত অনেক তথ্য গোপনের স্বার্থেই অন্তর্বর্তী সরকার তথ্য কমিশনকে অসাড় করে রেখেছিল। রাজনৈতিক সরকারকে সে পথ থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ার; মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়





