স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মানিক মিয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কার্যালয়ে অফিস সেক্রেটারি হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ প্রকাশিত হলে পরের বছরই পত্রিকার পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন তিনি। এ পত্রিকার সঙ্গে তিনি মাত্র দেড় বছর যুক্ত ছিলেন। ইত্তেহাদে কাজ করার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে তার। ভারত ভাগের পর মানিক মিয়া স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকা থেকে ইত্তেহাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বাধার কারণে শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগবিরোধী অবস্থান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার। প্রতিষ্ঠালগ্নে সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পরে এর সম্পাদক নিযুক্ত হন মানিক মিয়া। ১৯৫৩ সালে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত হয় পত্রিকাটি।
স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইত্তেফাক
এ সময়ে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা স্বৈরাচার আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে এক বছর জেল খাটেন মানিক মিয়া। ১৯৬৩ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ‘ঢাকা টাইমস’ ও ‘পূর্বাণী’ বন্ধ হয়ে যায়। পরে গণআন্দোলনের মুখে ইত্তেফাকের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানিক মিয়া ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন।
১৯৬৩ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মানিক মিয়া। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে সৃষ্ট দাঙ্গা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে ঢাকায় গঠিত ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’র প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন তিনি।
ষাটের দশকে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে মানিক মিয়া ছিলেন অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ১৯৬১ সালে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের বিরোধিতা করলে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য হিসেবে শতবার্ষিকী পালনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৩ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মানিক মিয়া। সরকারি উদ্যোগে গঠিত পাকিস্তান প্রেস কোর্ট অব অনার-এর সেক্রেটারি এবং পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজ-এর পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
১৯৬৯ সালের ১ জুন রাওলপিণ্ডিতে মারা যান তিনি। ১৯৭৪ সালের জুনে বঙ্গবন্ধুর নিদের্শে বতর্মান জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের রাস্তাটি তার নামানুসারে মানিক মিয়া এভিনিউ করা হয়।




