৭ স্থপতি
সূচনালগ্নেই লাল ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কমরেড মুজাফ্ফর

মুজাফ্ফর আহমদ (৫ আগস্ট ১৮৮৯ – ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৩)
অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৭৩)। পূর্ববঙ্গের সন্দ্বীপের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া মুজাফ্ফর যে কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই বেশ সচেতনভাবে রাজনৈতিক ভাবনায় স্পৃষ্ট হয়েছিলেন, সেটি বেশ অবাক করার মতো ব্যাপারই বটে।
তার বেড়ে ওঠার সময়েই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, মুসলিম লীগ গঠন, বঙ্গভঙ্গ রদের মতো ঘটনা ঘটলেও এসব তার মধ্যে বিশেষ আলোড়ন তোলেনি। এগুলোকে তিনি সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনীতি বলেই মনে করতেন; বরং সে সময় বঙ্গভঙ্গ রদে বয়কট, স্বদেশি আন্দোলন, গুপ্ত সংগঠন, সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান তাকে আকর্ষণ করেছিল বেশি। মোক্তার বাবার অর্থাভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মুজাফ্ফরের শ্রেণি-চেতনা প্রখর ছিল। ১৯১৩ সালে কলকাতায় এসে বঙ্গবাসী কলেজে আইএতে ভর্তি হলেও পাস করতে না পেরে পড়ালেখা ছেড়ে সংগ্রামী জীবনে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ঘটে। তারও আগে থেকেই মুজাফ্ফর রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে যোগ দিতে শুরু করেন। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সূচনালগ্নেই লাল ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। একই বছর মুজাফ্ফর আহমদ বঙ্গীয় প্রাদেশিক খেলাফত কমিটির সদস্য মনোনীত হন। ব্রিটিশবিরোধী চেতনা থেকেই তিনি খেলাফত আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। ওই বছরের ১২ জুলাই মুজাফ্ফর আহমদ নবযুগ পত্রিকায় যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকায় কর্মজীবী মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ফিচার লিখতেন।
১৯২২ সালের ১৫ মে The Vanguard of the Indian Independence শিরোনামে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম মুখপত্র প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালের শেষের দিকে মুজাফ্ফর আহমদ কমরেড আব্দুল হালিমের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তারা যৌথভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত করার দায়িত্ব নেন।
পার্টিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। দুই বছরেই তার নেতৃত্বে বাংলার ২৮ জেলায় পার্টির শাখা ছড়িয়ে পড়ে
এ সময়ে কর্মজীবী শ্রেণি আন্দোলনে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন তিনি। ১৯২৩ সালের ১৭ মে গ্রেপ্তার হন। এর কিছুদিন পরেই কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। অবশ্য কিছুকাল পর যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় মুক্তি পান। ১৯২৯ সালের ২০ মার্চ মুজাফ্ফর আহমদ কলকাতায় মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পুনরায় গ্রেপ্তার হন।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির এই অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ ও কংগ্রেস আমলে প্রায় ২০ বছর জেল খেটেছেন। কিন্তু আদর্শের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। জেলে থাকাকালীন রাজনৈতিক বন্দিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে দুবার অনশন ধর্মঘট করেন। প্রকাশ্যে রাজনীতি করায় বাধা এলে আন্ডারগ্রাউন্ডের ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন।
সংগঠক হিসেবে তার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। পার্টি ব্যবস্থাপনা, গণআন্দোলন, নির্বাচনের টানাপড়েন ইত্যাদি সম্বন্ধে মুজাফ্ফর আহমদের ছিল পরিষ্কার ধারণা। তিনি মার্ক্স-লেনিনের রচনাবলি ও কর্মজীবন সম্পর্কে বিশদভাবে জানতেন এবং দেশে প্রচলিত আইন ও নিয়মকানুন সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন। ফলে কমিউনিস্ট পার্টিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন।
১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সাল— এ দুই বছরেই তার নেতৃত্বে অবিভক্ত বাংলার ২৮ জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির শাখা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার সদস্য এতে যোগ দিতে শুরু করেন। ট্রেড ইউনিয়ন ও কিষাণ সভা গড়ে উঠতে থাকে সর্বত্র। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে মুজাফ্ফর আহমদ ছিলেন পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন হলে মুজাফ্ফর আহমদ কলকাতায় থেকে যান।
আজীবন পার্টিকে নেতৃত্ব দেওয়া মানুষটি মারা যান ১৯৭৩ সালে।




