কাহিনির গভীরতা ভবিষ্যতেও বিক্রি হবে

ছবি: আগামীর সময়
অতীতে মফস্বল সাংবাদিকতা যতটা প্রতিকূল ছিল, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে তাতে একটা বদল এসেছে। রাজধানী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভেদরেখা অনেকখানিই ঘুচে গেছে। আগামীতে এই সাংবাদিকতার গতি-প্রকৃতি কেমন হতে পারে তার একটা আভাস রইল বক্ষ্যমাণ রচনায়
২০৫০ সালের জুলাই মাসের এক সকাল।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঢাকা শহর ডুবে আছে। খবর আসছে— সারা দেশ, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আর সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানির নিচে। ১৯৮৮-৮৯ বা ২০৩১-এর পর এমন বন্যা আর দেখেনি মানুষ।
কারওয়ান বাজারের একটি মিডিয়া হাউজ। এক বিশাল ভার্চুয়াল ইন্টারফেসে বসে আছেন নিউজরুমের লোকজন।
মফস্বল সম্পাদক আকাশ আশরাফ বসে আছেন তার ডেস্কে। চোখে স্মার্ট ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়ালিটি) গ্লাস। সামনে ভাসছে বাংলাদেশের একটি লাইভ ডিজিটাল ম্যাপ— থইথই পানি, স্রোতের মতো দুলছে। সবকিছু রিয়েল টাইমে আপডেট হচ্ছে।
রৌমারীর ওপর একটি লাল সংকেত জ্বলে উঠতেই তিনি কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি নাহিদ রেজার আইডিতে ট্যাপ করলেন।
মুহূর্তেই তার সামনে ভেসে উঠল নাহিদের থ্রিডি (থ্রি ডাইমেনশনাল) হলোগ্রাম।
নাহিদ তখন রৌমারী উপজেলার যাদুরচরে বিশাল জলরাশির মাঝে ভাসমান একটি ট্রলারে। সময় সকাল ১০টা ৩০।
নাহিদ : শুভ সকাল। আমি আপনার কথাই ভাবছিলাম। আপনি কি আমার পাঠানো লাইভ ফিড দেখছেন?
আকাশ : শুভ সকাল। হ্যাঁ, রৌমারীর ভয়াবহ অবস্থা দেখছি। কিন্তু আমি আরও ডিটেইল চাই। আপনার চশমার সেন্সর কী বলছে? ওখানকার মানুষের
অবস্থা কী?
নাহিদ নিজের স্মার্ট চশমার ক্যামেরা ধীরে চারদিকে ঘুরিয়ে দেয়।
নাহিদ : আমি এখন ট্রলারের ওপর। চারদিকে কোনো লোকালয় নেই— মনে হচ্ছে সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। আমি আপনাকে ইমারসিভ মোডে (ফুল স্ক্রিন) দিচ্ছি... আপনি নিজেই দেখুন।
মানুষ সারা দিন যা দেখে, তার বাইরে কিছু পেলে সেটাই মনে গেঁথে রাখে। নেপথ্যের গল্প, কাহিনির গভীরতা এখনো বিক্রি হয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়— এই গভীরতা তৈরি করার সক্ষমতা আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি
আকাশ চশমার একটি বোতাম টিপতেই দৃশ্য পাল্টে যায়। মুহূর্তে তার মনে হয়, ঢাকার এয়ারকন্ডিশন্ড রুম ছেড়ে তিনি যেন যাদুরচরের বুকেই দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশে শুধু পানি। বাতাসের ঝাপটা আর অনন্ত জলরাশি— ৩৬০ ডিগ্রিতে।
আকাশ : আমি পানি ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না... নাহিদ, ওই যে দূরে একটা ট্রলার— ওটাতে জুম করুন। ওটা কি ত্রাণের ট্রলার?
নাহিদ : জি। ওখানে ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) আছেন— প্রশাসনের লোকজন। সৌরচালিত স্বয়ংক্রিয় এটি। তারা এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন— কোথাও কেউ আটকে আছে কি না, গবাদি পশু ভেসে যাচ্ছে কি না... আমাদেরটাও উপজেলা প্রশাসনের সরবরাহ করা।
একটু থেমে তিনি যোগ করেন, আমার চশমার এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বিশ্লেষণ বলছে, আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে রৌমারীর ইউএনও অফিসেও পানি ঢুকে যাবে। ড্রোন ক্যামেরা প্রস্তুত আছে।
আকাশ : ভালো। ড্রোন ফুটেজ সরাসরি সেন্ট্রাল ক্লাউডে আপলোড দেবেন। আর শোনেন— মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন? তারা কী বলছে? এআই তো মানুষের চোখের পানি ধরতে পারে না।
নাহিদ : জি, কিছুক্ষণ আগে স্থানীয় ইউপি (ইউনিয়ন পরিষদ) সদস্য আবদুল মজিদের সঙ্গে কথা বলেছি... তার ভিটা ডুবে গেছে। মানুষজন মহাসড়কে আশ্রয় নিয়েছে। বিদ্যুৎ নেই— ডিভাইস বন্ধ। চার্জের জন্য প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাইছে।
ইন্টারভিউটা অডিও-ভিজ্যুয়াল মোডে সেভ করেছি। চাইলে এখনই প্রিভিউ দিতে পারি।
আকাশ : পাঠান। এটা আজকের প্রাইম টাইম ভার্চুয়াল বুলেটিনে যাবে— দর্শক যেন মজিদদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি পায়।
একটু থেমে তিনি জিজ্ঞেস করেন—
আপনার ডিভাইস ঠিক আছে তো? স্যাটেলাইট সিগন্যাল?
নাহিদ : সব ঠিক আছে। ৬জি স্যাটেলাইট লিঙ্কে ৯৯ শতাংশ স্পিড পাচ্ছি। সোলার ফ্রেম দিয়ে চার্জ হচ্ছে।
আমি এখন ইউএনও অফিসের দিকে যাচ্ছি, তারপর মহাসড়কে— যেখানে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আপনারা চাইলে লাইভ দিতে পারি।
আকাশ : জানাব, আপনি সাবধানে থাকবেন। আর পাউবোর এআই ডেটাবেজ থেকে গত ৫০ বছরের বন্যার তুলনা নিয়ে একটা ইনফোগ্রাফি বানান। বিকালের মধ্যে ড্রাফট চাই।
কাল আরেকটা স্টোরি লাগবে কুড়িগ্রামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিয়ে। গত ১০ বছরের বরাদ্দ, কাজ, অনিয়ম— সব ডিটেইল। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে মামলা ধরে ইনভেস্টিগেট করবেন।
নাহিদ : ঠিক আছে। কাজ শুরু করছি।
নাহিদের হলোগ্রাম মিলিয়ে যায়।
আকাশ আবার ফিরে আসেন ঢাকার নিউজরুমের ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে; কিন্তু তার চোখে এখনো ভাসছে যাদুরচর।
২০৫০ সালে দাঁড়িয়ে— অর্জন আর অপূর্ণতা
দিনাজপুর এখন শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা নওগাঁকে ছাড়িয়ে যায়নি। এখানে এখন পৃথিবীর প্রায় সব জাতের আম ফলছে।
সে উপলক্ষে হয়ে গেল ‘গ্লোবাল ম্যাঙ্গো ফেয়ার’। দুই দিনের জন্য দিনাজপুর হয়ে উঠেছিল আমপ্রেমীদের নজরের কেন্দ্র। লাইভ ইভেন্ট, হলোগ্রাফিক ট্যুর, কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতামত, বিদেশি ক্রেতাদের সাক্ষাৎকার— সব মিলিয়ে এক ধরনের মিডিয়া উন্মাদনা। কভারেজ দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশের মিডিয়া অন্তত এশীয় মানে পৌঁছেছে।
কিন্তু আসল কাজটি করেছিল দেশের অসংখ্য কভারেজের ভিড়ে মাত্র একটি মিডিয়া আউটলেট।
তারা বলেছে, ‘দিনাজপুর কীভাবে বিশ্বের আমের রাজধানী হয়ে উঠল?’
এই একটি ডিটেইলড রিপোর্টই পুরো আলোচনাকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। মানুষের মনে তা গেঁথে যায়। রিপোর্ট প্রশংসা কুড়ায় দেশের বাইরেও। এখানেই একটি সত্য পরিষ্কার হয়ে যায় মানুষ সারা দিন যা দেখে, তার বাইরে কিছু পেলে সেটাই মনে গেঁথে রাখে। নেপথ্যের গল্প, কাহিনির গভীরতা এখনো বিক্রি হয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়;— এই গভীরতা তৈরি করার সক্ষমতা আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি।
এটা কি শুধু অ্যালগরিদমনির্ভর ব্যবসার ফল?
নাকি এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগহীনতা, ভয়, দৃষ্টিভঙ্গির দীনতা আর চৌকস সাংবাদিক তৈরি না হওয়ার অপারগতা?
আজ যে দু-একটি প্রিন্ট মিডিয়া টিকে আছে— তারাই এখনো এ ধরনের কাজ করছে।
ফলে একটি নতুন ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে : একটি ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, একটু গভীর বিশ্লেষণ মানুষকে প্রবলভাবে টানছে। তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— গত ১০ বছরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর জন্য যেভাবে মিডিয়া হাউজগুলো চাপে পড়েছে, নাজেহাল হতে হয়েছে সাংবাদিকদের, তাতে সহজেই বোঝা যায় সাংবাদিকতা এখনো আইনের শাসন আর গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম স্তম্ভ।
অপরাধী, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, আইনপ্রণেতা, বাজার বা টেন্ডার সিন্ডিকেট তটস্থ থাকবে— এমন চর্চাই সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখবে। আর ঝুঁকি? সে তো সাংবাদিকদের হাত ধরাধরি করেই চলে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক





