‘হাসজারু’ মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সংবাদমাধ্যমকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আস্থা ধরে রাখতে মৌলিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জোর দিচ্ছে, শরণাপন্ন হচ্ছে উন্নততর প্রযুক্তির। অন্যদিকে আয়ের জন্য বিজ্ঞাপনের চেয়ে পেইড সাবস্ক্রিপশন বা পেইড মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে। টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমকেও স্বতন্ত্র উপায়ের কথা ভাবতে হবে
বিশ শতকের শুরুতে যখন আধুনিক সাংবাদিকতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হচ্ছিল, তখন তথ্য ছিল শক্তির উৎস। কিন্তু একুশ শতকের তৃতীয় দশকে তথ্যের সেই শক্তি এক সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মুখোমুখি, যাকে বলা হচ্ছে ইনফরমেশন ডিসঅর্ডার বা তথ্য বিশৃঙ্খলা। ডিস-মিস-ম্যাল ইনফরমেশন— এমন নানান নামে ডাকা হচ্ছে নানা ধরনের ভুল ও মিথ্যা তথ্যকে। যে নামেই ডাকুক না কেন, যেকোনো ভুল তথ্যের প্রভাব অনেক গভীর। তথ্যের এই মহাপ্রলয়ে সত্য আজ এক কোণঠাসা নাবিকের মতো। অনেকটা জোনাথন সুইফটের সেই ৩০০ বছর আগের কথার মতো— ‘মিথ্যা যখন ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, সত্য তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার পিছে চলে।’ বর্তমান ডিজিটাল যুগে সেই মিথ্যা আলোর গতিতে পৃথিবী ভ্রমণ করে আসে, আর সত্য তখনো হয়তো তার জুতোর ফিতে বাঁধছে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এটির প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। কারণ, যুদ্ধে প্রথম যার মৃত্যু ঘটে, তা হলো সত্য।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে অপতথ্য এবং ভুল তথ্যকে বিশ্বের এক নম্বর স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অার রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বর্তমান সময়কে বলছেন উত্তর-সত্য বা পোস্ট-ট্রুথ যুগ। এখন সত্যের চেয়ে বিশ্বাস এবং যুক্তির চেয়ে আবেগ অনেক বেশি শক্তিশালী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বিশ্বব্যাপী যে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটে চলেছে, তাতে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলো মারাত্মক আস্থার সংকটে পড়ছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের মিডিয়া ট্রেন্ড প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ সাধারণ খবরের ওপর আস্থা রাখতে পারছে, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় ২২ শতাংশ কম। মিথ্যা কিংবা অপতথ্য এখন শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় এবং অরাষ্ট্রীয় কুশীলবরা পরিকল্পিতভাবে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। জেনারেটিভ এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সংবাদের সত্যতা যাচাই করা খোদ সাংবাদিকদের জন্যই কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘ডিপফেক’ ভিডিও কিংবা এআই-জেনারেটেড ছবি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এতে করে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের প্রাসঙ্গিকতা কমছে এবং তারা ইউটিউবার বা পডকাস্টারদের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক খবরের দিকে ঝুঁকছে।
দিনের সাদামাটা খবর এখন এআই চ্যাটবট দিয়েই তৈরি করা সম্ভব। টিকে থাকতে হলে সংবাদপত্রকে ‘অরিজিনাল ইনভেস্টিগেশন’ বা মৌলিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় মনোযোগ দিতে হবে
ভয়াবহ তথ্য বিশৃঙ্খলার যুগে বিপদ যখন পাহাড়প্রমাণ, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো হাত গুটিয়ে বসে নেই। বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্সের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রযুক্তি দিয়েই লড়াই করছে। ২০২৩ সাল থেকে বিবিসি তাদের ফ্যাক্ট-চেকিং বা সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে ‘বিবিসি ভেরিফাই’ চালুর মাধ্যমে। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা ছবির ভূ-অবস্থান (জিওলোকেশন) যাচাই এবং স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে ‘ওপেন সোর্স ইনভেস্টিগেশন’র মাধ্যমে সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করে। রয়টার্স এবং এপিরও নিজস্ব ফ্যাক্টচেক বিভাগ আছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক’র নীতিমালার অনুসরণ করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস ও অ্যাডোবি যৌথভাবে ‘কনটেন্ট অথেন্টিসিটি ইনিশিয়েটিভ’ (সিএআই) শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো ডিজিটাল কনটেন্টের একটি ‘পুষ্টিগুণ লেবেল’ (নিউট্রিশন লেবেল) তৈরি করা। তারা সিটুপিএ (কোয়ালিশন ফর কনটেন্ট প্রোভেনেন্স অ্যান্ড অথেনটিসিটি) নামে একটি কারিগরি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে একটি ছবির জন্মলগ্ন থেকে তার ওপর যতবার এডিট বা পরিবর্তন করা হয়েছে, তার সব ইতিহাস ছবির সঙ্গে ডিজিটাল সিগনেচার হিসেবে যুক্ত থাকে। এর ফলে পাঠক নিজেই দেখতে পারেন ছবিটি আসল ক্যামেরা থেকে এসেছে, নাকি কোনো এআই টুল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস তৈরি করেছে ‘জার্নালিজম ট্রাস্ট ইনিশিয়েটিভ’, যেটি সংবাদমাধ্যমের জন্য এক ধরনের নৈতিক সনদ বা আইএসও স্ট্যান্ডার্ড। এটি মূলত ১৩০টি কঠোর মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে কোনো গণমাধ্যমকে ‘বিশ্বস্ত’ হিসেবে সার্টিফাইড করে। এই সার্টিফিকেশন থাকলে গুগল বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমে সেই সংবাদপত্রের খবর বেশি দৃশ্যমান হয়।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ লড়াই অনেক বেশি অসম এবং জটিল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড হলো বিজ্ঞাপন। কিন্তু গত কয়েক বছরে সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপনী আয় গড়ে ৪৭ শতাংশ কমেছে; সরকারি বিজ্ঞাপন কমেছে ৫৭ শতাংশ। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের মিডিয়া ট্রেন্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো এখন বিজ্ঞাপনের চেয়ে সরাসরি গ্রাহকের দেওয়া সাবস্ক্রিপশন বা ‘পেইড মডেল’র ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। বিজ্ঞাপন বাজারের বড় অংশ গুগল ও মেটার কবজায় চলে যাওয়ায় সংবাদপত্রগুলো এখন ‘ইউনিক’ বা অন্যান্য কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠকদের অর্থ দিতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পেইড মডেলের ধারণা স্বপ্নই থেকে গেল। আর্থিক চাপে পড়ে বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম এখন ‘ক্লিকবেইট’ বা চটকদার শিরোনামের দিকে ঝুঁকছে। যখন সংবাদপত্রের আয়ের উৎস হয় ‘পে-পার-ক্লিক’ বা প্রতি ক্লিকে অর্থ, তখন সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে চটকদারি প্রাধান্য পাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক বড় সংবাদপত্রও এখন এমন সব শিরোনাম ব্যবহার করে, যা ভেতরে থাকা সংবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি বড় অংশ এখন দলীয় বৃত্তে বন্দি। বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোতে চলছে ‘বিটিভিকরণ’, মানে তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সরকারি যন্ত্রের মতো আচরণ করেছে। ফলে মানুষের আস্থা এখন মূলধারার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বেশি, অথচ সেখানে অপতথ্যের জয়জয়কার। আবার বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজই তথ্য যাচাইয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় বা এআই-চালিত টুল ব্যবহার করে না। এমনকি অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের কোনো লিখিত ফ্যাক্ট-চেকিং নীতি পর্যন্ত নেই। বিদেশি গণমাধ্যমগুলো এআইকে শুধু শত্রু হিসেবে নয়; বরং সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করেছে। ব্লুমবার্গ তাদের নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি করেছে, যা আর্থিক দলিলপত্র বিশ্লেষণে দক্ষ, বার্তা সংস্থা এপি করপোরেট আয়ের প্রতিবেদন তৈরির মতো রুটিন কাজগুলো এআই দিয়ে করিয়ে সাংবাদিকদের গভীর অনুসন্ধানী কাজে নিয়োগ করছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোকেও এসব নিয়ে ভাবতে হবে। রয়টার্স ইনস্টিটিউট বলছে, আগামী দিনে শুধু সাদামাটা খবর ছাপিয়ে সংবাদপত্র টিকবে না। দিনের সাদামাটা খবর এখন এআই চ্যাটবট দিয়েই তৈরি করা সম্ভব। টিকে থাকতে হলে সংবাদপত্রকে ‘অরিজিনাল ইনভেস্টিগেশন’ বা মৌলিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় মনোযোগ দিতে হবে।
ভয়াবহ তথ্য বিশৃঙ্খলার যুগে একদল আছে সুকুমার রায়ের সেই ‘বাবু’দের মতো— যারা আয়নায় গোঁফ আছে দেখার পরও বিশ্বাস করেন গোঁফ চুরি হয়ে গেছে। সমস্যা হলো— সংবাদমাধ্যমগুলো এই বাবুদের পাল্লায় পড়ছে। তাতে তাদের দশা হচ্ছে সেই ‘হাঁসজারু’র মতো— যাকে দেখতে পাখির মতো মনে হলেও আসলে সে এক বিদ্ঘুটে জন্তু। ফলে মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে— সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনেক সময়ই ‘টক্সিক ওয়েস্ট’ বা বিষাক্ত বর্জ্যে রূপ নিচ্ছে। এ কারণে সাংবাদিকতা পথটি কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’– এই কাঠিন্যই সাংবাদিকতার সৌন্দর্য। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি পাল্টাতে পারে, সংবাদপত্রের ফরম্যাট পাল্টাতে পারে, কিন্তু ‘সত্য’ পাল্টায় না। ‘আগামীর সময়’-এর নতুন যাত্রায় সত্যই হোক তাদের প্রধান পাথেয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




