খবর দেবে অ্যালগরিদম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অফিস-আদালতে যেতে হয় না, ছেলেমেয়েরাও হোমস্কুল করে, বই-খাতার বালাই নেই, সবকিছুই অনলাইনে তথা স্ক্রিনে এমন এক আগামীর দুনিয়ায়, যেখানে বিটিভি তো দূর বাত, বেসরকারি গণমাধ্যমেরই গ্রাহক পাওয়া মুশকিল, তখন সাংবাদিকতার চেহারা-চরিত্র কেমন হবে, রম্য ঢঙে সেটাই বলার চেষ্টা করেছেন লেখক
ডেটলাইন-ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০৫০।
আর দুই বছর পরই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ১০০ বছর। এই এক শতাব্দী আগেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল রাষ্ট্র আর তার ভাষার কাঠামো এমনি করে বদলে যাবে? ভাষার জন্য রক্ত বা আমার নিজের দেশ— কথাগুলো কি এখন শুধু একঘেয়ে ইতিহাস নয়? সে যাক, ৭৫ বছরের জীবনে কম তো দেখলাম না... চোখের সামনে অফিস-আদালতে যাতায়াত উঠে গেল, স্কুল-কলেজে যেতে হয় বটে, কিন্তু বই-খাতা জাদুঘর ছাড়া আর কোথায় পাচ্ছেন? কেমন থাকছেন, কী পরছেন, ঘুমানোর সময় কী শুনছেন— মানে জীবন-জীবিকা-সঙ্গী নির্বাচন সব জানে এখন এআই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটা লাগসই বাংলা হলে ভালো হতো। অবশ্য এআইর ভালো বাংলা না হলেও কোথাও আটকাচ্ছে না। আজকাল সবাই সবার এআইকে একটি হলেও আদরের নাম দিয়ে রাখছেন, আকিকা-মুখেভাত-জন্মদিনও হচ্ছে ধুমধাম করে। আমার জনের নাম বলাই।
বলাইয়ের কথা আপনাদের আরেক দিন বলব। সম্পাদক বন্ধু মানুষ, পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাগজে ছাপাতে হয় না বলে ভাববেন না মহাকাব্য বা উপন্যাস রচনা করবেন, পাঠকের অ্যাটেনশন স্প্যানটাও মাথায় রাখবেন। বলি বলি করেও বলা হলো না যে, অ্যাটেনশন দূরে, পাঠক কেন আমারে পড়বে? তার কী ঠ্যাকা? আমি তাকে নতুন কী বলব, যা সে জানে না? এমন একটা সময় ছিল, সত্যি বলছি আজব হলেও গুজব নয়, যখন কারও (ধরা যাক তারা সাংবাদিক) কাছ থেকে কোনো তথ্য জানা যেত। কেউ কেউ যে দুটো খবর শুনিয়ে তিনটে বিশ্লেষণসূচক বাক্য বলে খোরাকি জোগাড় করতেন, তাও কিছুটা সত্যি। দুই বা তিন যুগ ধরে আমরা সবাই সবাইকে তথ্য দিই বিশ্লেষণ শেখাই। কে নেয় কে-ইবা শোনে, তা জানে শুধু অ্যালগরিদম।
রেডিও বাংলাদেশ বা বিটিভির কথাই ধরুন না। আমাদের সময়ে বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন, জনমত তৈরিতে তার ভূমিকা এমনকি মিডিয়া দখল নিয়ে সাতকাহন সতেরো কিসসা হয়েছে। এখন বললে লোকে বিশ্বাস করবে? আচ্ছা বলুন তো শেষ কবে বিটিভি দেখেছেন, পারবেন না জানি, আপনার এআই থেকে জেনে বলুন। ওই যে সেবার তুর্কি সিরিয়াল এলো সুন্দর সুন্দর সব তরুণ-তরুণী। আচ্ছা খবর দেখেন, বিটিভির খবর? আপনি নিশ্চয়ই হাসছেন! প্রথম কথা, কোনটা খবর, তা আপনার কাছে পরিষ্কার না। তা ছাড়া বিটিভিও খবর দেখাত? কবে? এগুলা কিন্তু মুশকিলেরই প্রশ্ন। খবর কাকে বলে আর বিটিভি খবর দেখাত কি না? আমাদের ছেলেবেলায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ের সুরে স্মৃতিসৌধ হয়ে ঘড়ির হাত ধরে ৮টা বাজত।
তা ছাড়া বিটিভিও খবর দেখাত? কবে? আমাদের ছেলেবেলায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ের সুরে স্মৃতিসৌধ হয়ে ঘড়ির হাত ধরে ৮টা বাজত। আমরা শুনতে পেতাম সরকারপ্রধান কী বলেছেন, কী করেছেন। তাকে খবর বলে স্বীকার করা সেকালে কষ্টকর ছিল, একালে হাস্যকর
আমরা শুনতে পেতাম সরকারপ্রধান কী বলেছেন, কী করেছেন। তাকে খবর বলে স্বীকার করা সেকালে কষ্টকর ছিল, একালে হাস্যকর। সরকারপ্রধানের পর আসতেন তথ্যমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আর উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীরা। তারা টেবিলে বসে সরকারপ্রধানের সঙ্গে লাউ-চিংড়ি খেতেন, নেতার শিডিউল না পাওয়া গেলে বিরোধী দলকে কষে গাল দিতেন অথবা প্রধান অতিথি হয়ে হ্যান্ডবল বা তায়কোয়ান্দোর গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করতেন।
জন্ম থেকেই খবরের জন্য এ দেশের মানুষের ভরসা বিদেশি রেডিও আর টাচ ফোন এসে যাওয়ার পর সব জানেন এমন কিছু রাগী মানুষ। বুড়ো হয়েছি বলে খালি পুরনো সেই দিনের কথা মনে আসে। না শুধু বুড়ো হয়েছি বলে নয়, অজ্ঞতাও স্মৃতির শরণ নেওয়ার বড় কারণ। এখনকার কথা একেবারেই জানি না যে!
বিটিভি শেষ কবে দেখেছি, তা আমি তো মনে হয় না আমার বলাইও বলতে পারবে। ত্রিশের দশকে খুব ঘটা করে বিটিভির আন্তর্জাতিক চ্যানেল এলো। বলা হলো, সারা দুনিয়ার মানুষ ক্রেডিবল সোর্স হিসেবে বিটিভির কাছে আসবে। দেখিয়ে দেওয়া হবে প্রফেশনালিজম কত প্রকার ও কী কী। প্রথম সপ্তাহেই, ঠিক মনে পড়ছে না সম্প্রচারের প্রথম দিনই কি না, সরকার কত ভালো আর বিরোধীরা কত খারাপ, তা নিয়ে একটি গা ছমছমে ডকুমেন্টারি প্রচার হলো। আমরা আবার খবরের জন্য ফেসবুক, টুইটার আর হোয়াটসঅ্যাপে মনোযোগ দিলাম। রামপুরার টিভি ভবনে এখনো অনেকের আনাগোনা আছে শুনেছি, মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে গোটাদশেক শুনতে পাই, জানতে পারি না শুধু সেখানে কী হয়? আপনারা জানলে বলবেন তো আমাকে।
সরকারি টিভি-রেডিও মাথায় থাকুক, বেসরকারিরা কী করে এখন? এ আরেক মজার কথা। সরকার বাহাদুরের বাইরে কে আছে? তারা দেখতে কেমন? আমাদের দেশে আর কিছু থাকুক আর না-ইবা থাকুক আইন আছে, ডিসি এসপি ওসি আছে, আছে বিটিআরসি, আছে তরঙ্গ বরাদ্দ, আছে ডিজিএফআই, এনএসআই, আছে প্রাইম মিনিস্টারের প্রেস উইং। আমাদের ঘাড়ে বসা দুই ফেরেশতার মতো তারা আমলনামা লিখছেন। ও ভুলে গেছি, বিজ্ঞাপনদাতারা আছেন, বিজ্ঞাপন চাইতে গেলে গোল গোল চোখ করে আজকাল ওসব কেউ দেখে বলার জন্য দেশ-বিদেশের ট্রেনিং পাওয়া মার্কেটিং ম্যানেজাররা আছেন। আপনি কি ইনফ্লুয়েন্সার? গড় ভিউ কত? রিঅ্যাকশন? শেয়ার হয় কী রকম? কৃষ্ণচূড়ার মতো থোকা থোকা প্রশ্নগুলোও কষ্ট করে করতে হয় না, এআই আছে, আছে অ্যালগরিদম।
ম্যাকিয়াভেলি বা এরকমই কোনো মাথাওয়ালা লোক ৫০০-৬০০ বছর আগে বলে গিয়েছেন, ভালোবাসা নয়, জনতাকে একত্রিত করে ঘৃণা। তাই, আমরা পাথর ছুড়ে মারতেই শুধু কাঁধে কাঁধ মিলাই, থুতু দিতে ধরি আরেকজনের হাত। তারপর তাকে পাঁকে ডুবিয়ে রক্তপুঁজে ছিন্নভিন্ন করে সন্ধান করি নতুন শত্রুর। মহান শিকারি আমরা এই ২০৫০-এ; এখন আমি তথ্য, আমি মাইক্রোফোন, আমি পডকাস্ট, আমিই বিশ্লেষণ— আমার এআই আমার সার্চ ইঞ্জিন আছে, কারও থেকে কিছু জানার নেই আমার।
লেখক: নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ঠিকানা’র সম্পাদক





