সংবাদের অনুষঙ্গ হিসেবে দৃশ্যভাষার ব্যবহার বাড়বে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ কার্টুন। নির্মল হাস্যরস ছাড়াও সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কঠোর সমালোচনার এক মোক্ষম উপায় এই শিল্পমাধ্যমটি। বাংলাদেশের মতো নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের দেশে এই কার্টুন চর্চার পথ খুব মসৃণ নয়। আগামীতে কি এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে
জাতীয় পত্রিকায় কার্টুন এক উপাদেয় বিষয় পাঠকের কাছে। নির্মল হাস্যরস প্রকাশ থেকে কঠিন ও কঠোর সমালোচনার এক মোক্ষম উপায়ও বটে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জমিনে পত্রিকার পাঠককুলের বয়সে জাতীয় দৈনিকগুলোতে ব্যঙ্গদৃশ্য ভাষার উপস্থিতি গুণে-ভারে বেশ কার্যকর ভূমিকাই রেখেছিল। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পিপল’-এর সম্পাদকের বাংলাদেশপন্থি অবস্থান গ্রহণ করার উদ্দেশ্য শতভাগ চরিতার্থ করতে পেরেছিল সেই ব্যঙ্গদৃশ্যগুলো। তার প্রমাণও মিলেছিল নিদারুণ; হানাদারের অনলে জ্বলে ‘দ্য পিপল’ অফিস; তাদের গুলিতে মরেন নিরীহ কয়েকজন কর্মী। নিজ গৃহের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভগ্নহৃদয়ে সম্পাদক অবলোকন করেন তার সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা। আমাদের কার্টুন শিল্পের সৌভাগ্য— স্বাধীনতার মিছিলে শামিল হতে পেরেছিল সে।
ফিনিক্স পাখির মতো ছাই-ভস্মে স্বাধীন দেশের জাতীয় পত্রিকার বুকে আরও উচ্চকিত স্বরে ও সৌষ্ঠবে নবজন্ম নিল স্বনামের ব্যঙ্গচিত্র ধারা। আমাদের শৈশবের চিন্তন ও রসবোধের পাঠ জোগালেন সরেস টোকাইয়ের জনক রনবী। যেমন তার নামটি আহা! হস্তলিখিত বাণীগুলোতে যেন নির্বিকার-বিবেক হলো নেংটিধর ‘টোকাই’।
দেশ ডুবে গেল স্বৈরাচারের কোটরে। সৃজনের উদ্দীপনা সংকটেই জোটে। সমস্যা মানেই সম্ভাবনা। সদ্য গোঁফ ওঠা শিশির ভট্টাচাযর্ বন্ধুদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে নেন এই দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনে। ভট্টর রেখার দক্ষতা ও অঙ্গসংস্থাপন বিদ্যায় দখলের পাশাপাশি কটাক্ষের সহজাত প্রবৃত্তি কার্টুনের নান্দনিক দৃশ্যমানতা যেমন বাড়াতে সাহায্য করেছিল, তেমনি কার্টুনিস্ট নিজেই হয়ে ওঠেন এক স্বতন্ত্র এজেন্সি।
আমাকে এ জগতে আসতে হলো রুটি-রুজির অপেক্ষাকৃত উপযোগী সম্ভাবনায়। সমকালে ২০০৫ সালে সম্পাদকীয় পাতার সম্পাদক মিজানুর রহমান খান কার্টুনের সম্ভাবনাটি কাজে লাগাতে চাইছিলেন মতামত ও সম্পাদকীয় কলামের গুরুগম্ভীরতার কঠিন রূপটি আরও জনপ্রিয়করণের নিমিত্তে।
তার মনে হলো, আমাকে কাজে লাগানো যায় বটে; আমিও নতুন চ্যালেঞ্জটি নিজের নিলাম লুফে। সমকালের গুরুগম্ভীর সম্পাদকীয় লেখাগুলো পাঠকপ্রিয়করণের আইডিয়া সম্প্রসারিত হলো রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনমঞ্চ’-এ। পরে ২০০৯ সালে কালের কণ্ঠের ‘রাজকূট’ নামক সমধর্মী ম্যাগাজিনেও আমাকে যুক্ত করে নেওয়া হয়েছিল একই কারণে।
ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কার্টুন শুধু স্থিরচিত্রের মতো অনড় থাকবে না, তা সচল ও বর্ণনামূলকতার দিকে ঝুঁকে যাবে। পত্রিকার সম্পাদকদের সবাই তাদের প্রসঙ্গকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য আরও অধিকহারে নির্ভর করবেন দৃশ্যশিল্পীদের চিত্রিত বিবরণীর ওপর
এরই মধ্যে পত্রিকা জগতে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়ে গেছে। কার্টুন, ইলাস্ট্রেশন, ইনফোগ্রাফ, ডায়া গ্রামের মতো গ্রাফিকসের চিত্রিত কৌশলগুলো তথ্য উপস্থাপনায় ও পত্রিকার অঙ্গসজ্জায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয় পাতার সম্পাদকদের কাছে। শিল্পনির্দেশনা ও গ্রাফিকস বিভাগের ব্যস্ততা ও কলেবর, দুই-ই বেড়ে যায় একালে। যুক্ত হয় নতুন নতুন ফিচার পাতা ও ম্যাগাজিন। যুক্ত হন অনেক নবীন কার্টুনিস্ট যারা দৈনিক পত্রিকাগুলো ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাদের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। কার্টুনিস্ট মেহেদি হক; কিশোরের কাজ একদিকে যতই নাগরিক চিন্তার প্রতিনিধিত্বশীলতা অর্জন করে নিচ্ছিল, তেমনি তাদের সমালোচনামূলক দৃশ্যভাষা নব্য স্বৈরাচারের মনে বিষের সঞ্চার ঘটাতে থাকে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবে। নানা অজুহাতে শাসকের তিরস্কার, হুমকি-ধমকি ও নিপীড়ন নেমে আসে। সম্পাদকরা সেন্সরশিপের নিয়তি মেনে নিতে থাকেন বাস্তবতার দোহাই পেড়ে। কার্টুনিস্টরা স্বাভাবিকভাবেই দমে যেতে থাকেন। অপেক্ষাকৃত নিরীহ অলংকারধর্মী ও বর্ণনামূলক নকশাপ্রধান নতুন কার্টুনগুলোতে বক্তব্যধর্মিতা উধাও হতে থাকে; এর বিপরীতে তা ইনফোগ্রাফের বর্ধিত ক্যারিকাচারিক রূপে পরিণত হয়। এদিকে পত্রিকায় সেন্সরশিপের প্রতিক্রিয়ায় প্রান্তজনের মতপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যম। ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা, দায়বদ্ধতার বেড়াজালহীন এই ভার্চুয়াল জগতে কার্টুনের মতো শক্তিশালী মাধ্যমের একদিকে যেমন দ্রুত জনপ্রিয়তার জোয়ার বইছে, তেমনি অন্যদিকে ঘটাচ্ছে নানা বিতর্ক ও বিপত্তি। শালীনতা ও শিষ্টাচারের মতবিচারিকতার বিপরীতে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতার নেশা পেয়ে বসেছে যেন অনেকের চিন্তায়। তথ্যের মেরূকরণের প্রবণতা নাগরিকদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীন ও অসহিষ্ণু করে তুলেছে। কার্টুনের প্রতিও তৈরি হয়েছে ক্ষমতা কাঠামোর সন্দেহ। বর্তমানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই সমস্যার সমাধান প্রায় অসম্ভব করে তুলছে আমাদের মতো কমজোরি সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য। এর প্রভাব পড়ছে পত্রিকাগুলোতেও।
নব্বইয়ের স্বপ্ন ধ্বংসের নিদারুণ বাস্তবতা হলো জুলাই বিপ্লব। সময়ের কার্টুনিস্টরা কার্যকরভাবেই শামিল হলেন এই ন্যায়যুদ্ধে। এবারও দেশের এই সন্ধিক্ষণের ভাষা জোগাতে ব্যর্থ হননি কার্টুনিস্টরা। মেহেদি হক, সিমু নাসেরদের ক্ষুরধার চিন্তা ও আইডিয়াবাজিতে যথাযথভাবেই চিহ্নিত হয়েছে জুলাইয়ের ক্রোধ। রশি ধরে টান মেরে রাজাকে খানখান করে দেওয়ার এনার্কিস্ট উত্তেজনা জনতার চাওয়াকেই প্রতিফলিত করতে পেরেছে। দৃশ্যভাষাপ্রধান যোগাযোগমাধ্যমে অভ্যস্ত ভার্চুয়াল মেটারিয়াল যুগের তরুণ-কিশোরদের দখলে চলে গেল মেগাসিটি, সিটি ও মফস্বলের দেয়ালগুলো। রাতারাতি সেগুলো পরিবর্তিত হলো যেন সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ালের এক বাস্তবিক দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিংয়ে। বাংলা-ইংরেজি-আরবি-সংস্কৃতির কাঁচা-পাকা হাতের ক্যালিগ্রাফি আর দৃশ্যকথনের বিকট চিৎকারের আঁচ লেগে যায় মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধে। আমাদের ঘর পুড়ে যায়; পুড়ে যায় পুরনো সব বন্দোবস্ত।
নতুন বাংলাদেশে যখন সব প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকার জাতীয় দৈনিকগুলোও সম্মুখীন দিশা খোঁজার তাগিদায়, সেখানে মুদ্রিত পত্রিকার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ছাপানো স্থির ব্যঙ্গচিত্র কি আর রেহাই পাবে! না, আমরা অনিবার্যভাবেই প্রযুক্তির চতুর্থ প্রজন্মে চলে এসেছি। হয় আমরা একে বুঝব, না হয় এই নতুন প্রযুক্তিই আমাদের বুঝে নেবে। এর আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক অমোঘ বাস্তবতায় বাংলাদেশের কাগজে প্রকাশিত মুদ্রণ শিল্প ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকবে, পত্রিকা প্রকাশনা শিল্পের মূল মাধ্যম হয়ে উঠবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। যার প্রকৃতি ও প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই দৃশ্যভাষার ব্যবহার বাড়বে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কার্টুন শুধু স্থিরচিত্রের মতো অনড় থাকবে না, তা সচল ও বর্ণনামূলকতার দিকে ঝুঁকে যাবে। আমি নিশ্চিত, পত্রিকার সম্পাদকদের সবাই তাদের প্রসঙ্গকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য আরও অধিকহারে নির্ভর করবেন দৃশ্যশিল্পীদের চিত্রিত বিবরণীর ওপর। ভবিষ্যতে হাতে আঁকিয়েদের বিপরীতে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে দক্ষ নবীন শিল্পীরা ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপে প্রসঙ্গকে পূর্ণাঙ্গ তথ্যেই তুলে ধরতে পারবেন এতে। রূপকল্পের ব্যবহার কমে যাবে, প্রায়োগিক অর্থের চিহ্নমূলক দৃশ্যরূপের জয়জয়কার হবে। এটা হবে স্থানিক পাঠকমানের কারণেই। এই বর্ণনামূলক সচল ক্যারিকাচারগুলোতে অনুষঙ্গ হিসেবে টাইপোগ্রাফির দৃশ্যরূপের বদলে কার্টুনের চরিত্রদের বয়ান হিসেবে অডিও যুক্ত হবে ঘটনার বক্তব্য উপস্থাপনে। প্রযুক্তি-বাস্তবতার অনিবার্যতায় ভাষা ও কৌশল পাল্টায়, পুরনো হবে স্মৃ্তি সংরক্ষণের বিষয় মাত্র। কিন্তু সংবাদের অনুষঙ্গ হিসেবে কার্টুনের চাহিদা বাড়বে বৈ কমবে না। নতুন ধারার সেই ক্যারিকাচার শিল্পচর্চা ভার্চুয়াল পরিসরের যোগাযোগ-বৈশিষ্ট্যের সব সম্ভাবনা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম হবে বলেই আমার মত।
লেখক: চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর; শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





