জীববৈচিত্র্য কমে গেলে জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে

খাদ্য নয় এমন উদ্ভিদ ও প্রাণী ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে আমাদের মনোযোগ খুব কম, ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলোর বিনাশেই উৎসাহ বেশি। সাপ-বেজি থেকে হাতি- সব ধরনের প্রাণী নিধনে আমরা তৎপর সেটা পত্রিকার পাতা খুললেই টের পাওয়া যায়। বারান্দায় দুটো লাভ বার্ড আর কিছু মানিপ্লান্ট লাগিয়ে আমরা ভাবি যে খুব পরিবেশ চর্চা করা হলো
২০৫০ সালের এক সকাল। ঢাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির কক্ষে ‘বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী’ নিয়ে ক্লাস চলছে। দেয়ালে ঝুলছে বড় ডিজিটাল পর্দা। সেখানে একে একে ভেসে উঠছে নানা প্রাণীর ছবি। হরিণ, বানর, কুমির, পাখি, তারপর হঠাৎ দেখা গেল বিশাল ধূসর এক প্রাণী। লম্বা শুঁড়, মোটা পা, বড় কান।
শিক্ষিকা হেসে বললেন, ‘এটা কে বলতে পারবে?’
একসঙ্গে কয়েকটি হাত উঠে গেল।
‘এটা হাতি, ম্যাম!’
‘ঠিক বলেছ’, শিক্ষিকা বললেন মাথা নেড়ে। ‘কিন্তু জানো, একসময় এই হাতি বাংলাদেশেও ছিল।’
শ্রেণিকক্ষে হালকা গুঞ্জন উঠল। ‘বাংলাদেশে?’ বিস্ময়ে চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল এক শিশু। আরেকজন বলল, ‘চিড়িয়াখানায়?’
শিক্ষিকা মৃদু হেসে বললেন, ‘না, শুধু চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্ক নয়। জঙ্গলে। পাহাড়ি বনে। দলে দলে চলাফেরা করত। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, শেরপুরের বন-পাহাড়ে তারা ছিল। বর্ষার রাতে তারা নদী পেরোত, পাহাড়ি পথ ধরে চলত, বাঁশঝাড় ভেঙে এগিয়ে যেত।’
‘তাহলে এখন নেই কেন ম্যাম?’ পেছন সারি থেকে প্রশ্ন এলো। শিক্ষিকার মুখে একটু ছায়া নামল।
‘কারণ, আমরা বনকে আগের মতো থাকতে দিইনি।’
তিনি পর্দায় পরের ছবি দেখালেন, একটি উল্লুক, দুই হাত উঁচু করে ডালে ঝুলছে।
‘এটাও বাংলাদেশে ছিল। ভোরবেলা সিলেটের বনে এদের ডাক শোনা যেত।’
পর্দায় এবার পুরনো বাংলাদেশের মানচিত্র উঠল। সবুজ রঙে ঘেরা বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল।
২.
একসময় বাংলাদেশের গ্রামঘেঁষা পাহাড়ি বন কিংবা গভীর অরণ্যে হাতির দল চলাফেরা করত নিজেদের মতো করে। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যদি বর্তমান ধারা একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে বন্য হাতি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওপরের চিত্রটির মুখোমুখি হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়।
বাঘ, চিতা বাঘ, ভালুকসহ বড় আকারের প্রাণীগুলোর টিকে থাকার জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থল প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ বন এখন আর আগের মতো নেই। সুন্দরবন কিছুটা প্রাকৃতিক অবস্থায় টিকে থাকলেও বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি অনেকটাই খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে।
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হাতির ওপর। একসময় যেখানে হাতিরা অবাধে চলাচল করত, সেই পথগুলো এখন দখল হয়ে গেছে বসতি, রাস্তা আর চাষের জমিতে। যেখানে হাতি পানি পান করত বা গোসল করত, সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় হাতি বাধ্য হয়ে মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়ছে, ফসল নষ্ট করছে। মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ছে। প্রায়ই শোনা যায়, হাতির আক্রমণে মারা যাচ্ছে মানুষ। আবার মানুষের প্রতিশোধে হাতিও নিহত হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাতির ধীর প্রজনন হার। সাধারণত একটি হাতি তিন থেকে চার বছরে একটি করে শাবকের জন্ম দেয়। এই ধীর প্রজননের ফলে কোনো কারণে সংখ্যা কমে গেলে, তা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হয় না। তাই একদিকে বাড়তে থাকা সংঘর্ষ, অন্যদিকে ধীর প্রজনন— এ দুই মিলিয়ে হাতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
তবে সবকিছুই অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সুন্দরবন এখনো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। এর পেছনে রয়েছে ভালো ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি। স্থানীয় মানুষ এখন বুঝতে পারছে, বনের সুরক্ষা মানেই তাদের নিজেদের সুরক্ষা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে বেশি কথা বলছে, কাজ করছে। বিভিন্ন সংগঠন এবং স্থানীয় উদ্যোগ এ কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য একটি সংকটময় সময় পার করছে। আমাদের সমাজ এখনো পুরোপুরি প্রাণীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। গাছপালা আর প্রকৃতির প্রতি যত্ন অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে ঘরের বারান্দায়। তবুও আশা আছে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণের উন্নতি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এখন বন্যপ্রাণীর চলাচল, সংখ্যা এবং আচরণ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা আরও উন্নত হবে। এতে কোন প্রজাতি কোথায় আছে, কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে— এসব বিষয় আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। এ তথ্যগুলো সংরক্ষণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রেও উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং বন সংরক্ষণে আইন আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগও জরুরি।
এখন প্রশ্ন হলো, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেলে এর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে?
প্রথমত, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা রয়েছে। যেমন ব্যাঙ পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। সাপ ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করে। ছোট পাখি এবং বাদুড় মশা-মাছি খায়, ফলে রোগবালাই কম ছড়ায়। এসব প্রাকৃতিক সেবা আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না কিন্তু এগুলো ছাড়া আমাদের জীবন হয়ে যেত অনেক কঠিন।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জীববৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গৃহপালিত প্রাণী এবং ফসলের উন্নত জাত তৈরির জন্য বন্য প্রজাতির প্রয়োজন। কারণ, বন্য প্রজাতিতে এমন বৈশিষ্ট্য থাকে, যা রোগ প্রতিরোধে বা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
ধরা যাক, কোনো রোগে গৃহপালিত মুরগি মারা গেল। তখন বন্য মুরগি থাকলে সেখান থেকে আবার নতুন করে বংশবিস্তার শুরু করা সম্ভব। কিন্তু যদি বন্য প্রজাতিই না থাকে, তাহলে সেই সুযোগ আর থাকবে না। একইভাবে গরুর ক্ষেত্রেও যদি বন্যজাত না থাকে এবং কোনো বড় রোগে গৃহপালিত গরু মারা যায়, তাহলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, জীববৈচিত্র্য অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। পরিবেশবান্ধব পর্যটন একটি বড় সম্ভাবনা। পৃথিবীর অনেক দেশ এ খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, এমনকি ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালও এ খাতে সফল। বাংলাদেশেও এ সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু বিদেশি পর্যটক নয়, দেশীয় পর্যটনও স্থানীয় মানুষের জীবিকায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ থেকেও মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়। গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বন থেকে শাকসবজি সংগ্রহ করে, নদী থেকে মাছ ধরে। অনেক ঔষধি উদ্ভিদও বনের ওপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য কমে গেলে এসব সুবিধাও হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের জীবিকার সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। জীববৈচিত্র্য কমে গেলে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
মানসিক দিক থেকেও প্রকৃতির গুরুত্ব কম নয়। একটি নির্মল পরিবেশ মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। সকালে পাখির ডাক, সবুজ গাছপালা, খোলা আকাশ মানুষের মন ভালো রাখে। এর বিপরীতে দূষিত, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ মানুষের মেজাজ খারাপ করে দেয়। তাই জীববৈচিত্র্য শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য একটি সংকটময় সময় পার করছে। একদিকে দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ। আমাদের সমাজ এখনো পুরোপুরি প্রাণীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। গাছপালা আর প্রকৃতির প্রতি যত্ন অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে ঘরের বারান্দায়।
তবুও আশা আছে। সচেতনতা বাড়ছে, গবেষণা এগোচ্ছে, মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে প্রকৃতির গুরুত্ব। এ ধারাটি যদি শক্তভাবে ধরে রাখা যায়, তাহলে হয়তো ২০৫০ সালের বাংলাদেশ পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যাবে না।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





