একা এবং একসঙ্গে আমীরুল ইসলাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমীরুল ভাই পৃথক এক গ্রহের মতো ছিলেন। তার চিন্তার রাজ্যে সেই ভিড়ের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। দূর থেকে তাকে মুড়ির মতো ছটফটে অনেক কলরবের ভিতরে আবিষ্কার করলেও অন্তর্গত চলাচলে ছিলেন একা। সেই এক পৃথক গ্রহের মতো উপস্থিতি। বলয়ের ভেতরে অবর্তিত হচ্ছে অনেক উপগ্রহ, কিন্তু গ্রহের ওপর তারা ছায়াপাত করে না। সেই ভ্রমণে শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ছিলেন একা। হয়ত মৃত্যু তাকে বয়ে নিয়ে গেল এই কোলাহল থেকে নৈঃশব্দের সমুদ্রে।
এই লেখা যখন লিখছি আমীরুল ভাই তখনও হাসপাতালের বেডে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই সন্ধিক্ষণ সময়টা কেমন কেউ জানে? না, কারো পক্ষেই তা জানা সম্ভব নয়। হয়ত ছায়াময় একটি পথ, হয়ত ধূসর অথবা ঝকঝকে করে ধোয়ামোছা কোনো সুড়ঙ্গ। সেখান দিয়ে সময় বয়ে যায়, বয়ে যায় মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত।
বড় একটা ঘড়ির কাটা অদৃশ্যে ঘুরে চলেছে ক্ষণ গণনা করতে করতে। কখন হাত তুলে নেবে জীবন, হাত ধরবে অমোঘ মৃত্যু কারো জানা নেই। জীবন এমনই এক নাট্যমঞ্চ। আমীরুল ভাই সেই মঞ্চে ছিলেন একক অভিনেতা। উপস্থিত দর্শক করতালি বাজাচ্ছে, আর তিনি লিখছেন, পাঠ করছেন, ভাবছেন। নিজের সৃষ্টির ভিতরে তিনি ছিলেন এক একক দুর্ধর্ষ চরিত্র।
সেই সন্ধিক্ষণের ঘনিয়ে ওঠা এই ছায়া ছায়া সময়ে লেখাটা লিখতে লিখতে তাকে দেখতে পাচ্ছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলাবাজারে কোনো প্রকাশকের ঘরে, লেখার টেবিলে, কোনো বিখ্যাত রেস্তোরাঁর ভিড়ে অথবা ঢাকা শহরের রাস্তায়। দেখা হলে ‘কী মিয়া, খবর কী’ সেই চিরকালের চেনা সম্ভাষণের ধ্বনি কানে এসে আছড়ে পড়ছে এখন।
তাকে ঘিরে বন্ধু আছে, আত্মীয়-স্বজনেরা আছে। কিন্তু আমীরুল ভাইয়ের একান্ত নিজস্ব সংসার বলতে কিছু ছিল না। বিয়ে করেননি। এক ধরনের বোহেমিয়ান জীবনকে অধিকার জেনে নিজের দখলে রেখেছিলেন। সেই জীবনের তিনিই ছিলেন অধীশ্বর। নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এবং একটি লক্ষ্যের দিকে ছুটিয়ে দিতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার মধ্যে।
এই শহরে কাকে চিনতেন না তিনি! সাহিত্যের জগতে তাকে চিনত না এমন মানুষের সংখ্যাও ছিল কম। এই শহরে বিচিত্র পেশার মানুষ, নানা ধর্মের মানুষ, মতের মানুষের সঙ্গে ছিল তার গভীর সখ্য। সবাইকে চিনতেন তার আদ্যোপান্তসহ। এই শহরের একটা সময়ের ইতিহাস ছিল তার কাছে নিজের হাতের তালুর মতো জানা। কিন্তু শেষমেশ আমীরুল ইসলামকে চেনাটা কঠিন ছিল বলেই মনে হয়েছে সব সময়।
ঘরহীন, দুয়ারহীন এক ঘরে বসবাস করা এক মানুষটির মধ্যে কোথাও একটা অদৃশ্য দেয়াল তোলা ছিল। আর সেই দেয়ালের আড়ালে তিনি একা বসবাস করতেন। সেখানে সম্ভবত কেউ-ই প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। এই আড়ালটুকু তার সৃষ্টিকর্মের আড়াল। একটা জীবন জুড়ে প্রচুর লিখেছেন তিনি।
শিশুদের জন্য ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ। অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। শিশু সাহিত্যিক হিসেবে দায়িত্ব হিসেবেই সেই পরিশ্রমটুকু তিনি অবলীলায় করেছেন। লেখালেখি এবং পড়াশোনার গভীরতা তাকে আলাদা এক সত্তায় পরিণত করেছিল। তার কাছে অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী একটা আকর্ষক বলয় ছিল। আমার বিকর্ষণও ছিল। অবলীলায় সত্য বলতেন আবার আষাঢ়ে গল্প বলায় জুড়ি ছিল না তার। ফলে তাকে ঘিরে অন্যদের সবসময়ই ছিল কৌতুহল আর আকর্ষণ।
লেখা ফুরিয়ে এলো, সেই সন্ধিক্ষণও বোধহয়। ছায়া ছায়া সরণী বেয়ে আমীরুল ভাইও হয়ত যাত্রা করলেন নিঃস্তব্ধ সমুদ্রের দিকে, যেখান থেকে ঢেউ এসে নিয়ে গেল তাকে অনতিক্রম্য দূরত্বে। এই শহরের রোদ-বৃষ্টি, শীত-বসন্ত সেই হাসিমুখ, প্রাণবন্ত মানুষটিকে আর স্পর্শ করবে না। আড্ডার টেবিল ঘিরে ছটফটে মুড়ির মতো ফুটতে থাকবে না অসংখ্য কথা। আমীরুল ভাই একবার বলেছিলেন, ‘নীরবতাই আসলে মৃত্যু বুঝলা মিয়া। তুমি বাঁইচা থাকলেও ওইটা মৃত্যু।’
নীরবতার পর্দা নামল একক গ্রহ আমীরুল ইসলামের জীবনে। একসঙ্গে থেকেও আবার একা হয়ে গেল একজন মানুষের জীবন। আমাদের আর দেখা হলো না।




