নবীজির ঘোষণায় কুস্তুল হিন্দির ঔষধি গুণ

সুগন্ধি চন্দন
বিশ্ব জুড়ে যখন ভেষজ চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক ওষুধের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে, তখন চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের চিকিৎসাগত উপকারিতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তার চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনাগুলো শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণাই নয়, বরং মানবকল্যাণে বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ দিকনির্দেশনাও বহন করে। এমনই একটি মূল্যবান ভেষজ হলো আল-কুস্তুল হিন্দি (القسط الهندي), যা বাংলায় অনেক সময় ‘ভারতীয় চন্দন কাঠ’ নামে অনূদিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أُمِّ قَيْسٍ بِنْتِ مِحْصَنٍ قَالَتْ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلميَقُوْلُ عَلَيْكُمْ بِهٰذَا الْعُودِ الْهِنْدِيِّ فَإِنَّ فِيهِ سَبْعَةَ أَشْفِيَةٍ يُسْتَعَطُ بِه„ مِنَ الْعُذْرَةِ وَيُلَدُّ بِه„ مِنْ ذَاتِ الْجَنْبِ
উম্মু কায়স বিনতে মিহসান (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘তোমরা ভারতীয় কুস্ত ব্যবহার করবে। কেননা এতে সাতটি রোগের আরোগ্য রয়েছে। গলার রোগে এটি নাক দিয়ে টেনে নেওয়া হয় এবং পার্শ্বব্যথার চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহৃত হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৯২)
হাদিসের এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক গভীর ইঙ্গিত। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। হাদিসে ব্যবহৃত ‘আল-কুস্তুল হিন্দি’ বলতে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও উদ্ভিদবিশারদ প্রচলিত সুগন্ধি চন্দন (Sandalwood) বোঝান না; বরং Saussurea lappa নামের একটি সুপরিচিত ভেষজ উদ্ভিদকে বোঝান। বাংলা অনুবাদের কারণে একে অনেক সময় ‘চন্দন কাঠ’ বলা হলেও গবেষকদের মতে এটি ভিন্ন উদ্ভিদ।
ইমাম নববী (রহ.) তার শারহু সহিহ মুসলিম-এ উল্লেখ করেছেন, হাদিসে ‘সাতটি আরোগ্য’ বলতে নির্দিষ্ট সাতটি রোগও বোঝানো হতে পারে, আবার বহু প্রকার চিকিৎসাগত উপকারিতার প্রতিও ইঙ্গিত থাকতে পারে। হাদিসে বিশেষভাবে গলার প্রদাহ এবং পার্শ্বদেশের ব্যথার চিকিৎসায় এর ব্যবহারের কথা এসেছে।
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষক ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) যাদুল মাআদ গ্রন্থে লিখেছেন, কুস্তুল হিন্দি শরীর উষ্ণ রাখে, কফ দূর করতে সাহায্য করে এবং শ্বাসতন্ত্রের কিছু সমস্যায় উপকারী। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, সে সময় এটি গুঁড়া, তেল কিংবা ধোঁয়ার মাধ্যমে চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো।
আধুনিক গবেষণাও এ ভেষজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, Saussurea costus উদ্ভিদে costunolide ও dehydrocostus lactone নামের সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় এসব উপাদানের প্রদাহনাশক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, জীবাণুরোধী এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা গেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে আরও বিস্তৃত মানবভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। তাই কোনো অবস্থাতেই একে সব রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
ইসলাম চিকিৎসাকে উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসাও তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৭৮) অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)
মহানবী (সা.)-এর এই দিকনির্দেশনা আমাদের শেখায়, আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষের উপকারের জন্য অসংখ্য প্রাকৃতিক সম্পদ সৃষ্টি করেছেন। সেগুলোর উপকারিতা অনুসন্ধান করা, গবেষণা করা এবং সঠিকভাবে কাজে লাগানো মানবজাতির দায়িত্ব। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ইসলামের শিক্ষা কখনো অন্ধ বিশ্বাসের নয়; বরং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার সঙ্গে নববী নির্দেশনার সমন্বয় ঘটিয়েই একজন মুসলিম সুস্থতা অর্জনের চেষ্টা করবে। এভাবেই নবীজির চিকিৎসা-দর্শন আজও মানবকল্যাণে প্রাসঙ্গিক, বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধানকে অনুপ্রাণিত করে এবং আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়।




