ইসলাম ও প্রচলিত আইনের চোখে প্র্যাঙ্ক ভিডিও

প্রতীকী ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন ধরনের বিনোদন জনপ্রিয় হয়েছে, যার নাম ‘প্র্যাঙ্ক ভিডিও’। দর্শককে হাসানোর অজুহাতে অপরিচিত মানুষকে বিব্রত করা, ভয় দেখানো, মিথ্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কিংবা গোপনে ভিডিও ধারণ করে তা প্রকাশ করা এখন অনেক কনটেন্ট নির্মাতার নিয়মিত চর্চা। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো নিছক অভিনয় বা পূর্বপরিকল্পিত হলেও, বাস্তবে অসংখ্য ভিডিওতে মানুষের সম্মান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, এমন বিনোদনের মূল্যায়ন ইসলাম এবং প্রচলিত আইন কীভাবে করে?
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক হাসি-আনন্দকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও পরিমিত রসিকতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে তাঁর রসিকতায় কখনো মিথ্যা, প্রতারণা, অপমান কিংবা কারও হৃদয়ে কষ্ট দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। এ কারণেই ইসলাম আনন্দের সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং স্বাধীনতার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে শেখায়।
প্র্যাঙ্ক ভিডিওর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এগুলোর অধিকাংশই মিথ্যা পরিস্থিতি তৈরি করে মানুষের রিএ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া আহরণ করতে চায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৫)। অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও মিথ্যা পরিহার করে, আমি তার জন্য জান্নাতের মধ্যভাগে একটি ঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করছি।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০০)
শুধু মিথ্যাই নয়, অনেক প্র্যাঙ্কে মানুষের মনে আতঙ্কও সৃষ্টি করা হয়। কখনো ডাকাত, পুলিশ বা অপহরণকারী সেজে, আবার কখনো নকল অস্ত্র বা ভয়ংকর প্রাণীর মাধ্যমে মানুষকে ভয় দেখানো হয়। অথচ ইসলাম মানুষের নিরাপত্তাবোধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (সহিহুল জামে, হাদিস: ৭৬৫৮)
প্র্যাঙ্ক ভিডিওর আরেকটি গুরুতর দিক হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ভিডিও ধারণ করে লাখো মানুষের সামনে প্রকাশ করা শুধু সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী নয়, ইসলামি নৈতিকতারও বিরোধী। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২) এই আয়াত মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়।
বাস্তবে অনেক প্র্যাঙ্ক ভিডিওতে নারীদের বিব্রত করা, অশালীন অঙ্গভঙ্গি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, কুরুচিপূর্ণ সংলাপ কিংবা অশ্লীল উপস্থাপনা দেখা যায়। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না, সমাজে অশ্লীলতার সংস্কৃতিকেও উসকে দেয়। অথচ মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নূর, আয়াত: ১৯)
ইসলামে মানুষের সম্মান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪) তাই কাউকে জনসমক্ষে হাসির পাত্র বানানো বা অপদস্থ করে বিনোদন সৃষ্টি করা ইসলামের দৃষ্টিতে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ধরনের ভিডিও অনেক সময় বাস্তব ক্ষতিরও কারণ হয়। আতঙ্কে কেউ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন, হৃদ্রোগী অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তি মানসিক আঘাত পেতে পারেন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধে ক্ষতি করা যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০) এই নীতিই প্রমাণ করে যে, অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে বিনোদন ইসলামে বৈধ হতে পারে না।
শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনও ব্যক্তির মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কারও সম্মতি ছাড়া এমন ভিডিও ধারণ বা প্রচার, যা তার মানহানি, হয়রানি বা ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর মানহানিসংক্রান্ত বিধান এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্র্যাঙ্কের নামে কারও ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন করলে শুধু নৈতিক নয়, আইনি জবাবদিহিতারও মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সব ধরনের প্র্যাঙ্কই সমান নয়। যদি কোনো ভিডিও সম্পূর্ণ অভিনয়নির্ভর হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্বসম্মতি থাকে, কাউকে অপমান, প্রতারণা বা আতঙ্কিত না করা হয় এবং তাতে শালীনতা বজায় থাকে, তাহলে সেটি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় অধিকাংশ প্র্যাঙ্কই মানুষের আবেগ, সম্মান ও গোপনীয়তাকে উপেক্ষা করে নির্মিত হয়, যা ইসলামি নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের উচিত এমন সকল কাজ থেকে বিরত থাকা, যা অন্যের অধিকার নষ্ট করে বা সমাজে অনৈতিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ভিউ, লাইক কিংবা অর্থের চেয়ে মানুষের সম্মান অনেক বড়। যে বিনোদন মানুষের চোখে হাসি আনলেও কারও হৃদয়ে অপমান, ভয় বা কষ্টের জন্ম দেয়, তা কখনো প্রকৃত বিনোদন হতে পারে না। ইসলাম যেমন মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেয়, তেমনি রাষ্ট্রীয় আইনও সেই মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার সংরক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাই দায়িত্বশীল, সত্যনিষ্ঠ ও মানবিক ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আজ সময়ের দাবি।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




