কিয়ামতের দিন সর্বোত্তম বান্দার স্বীকৃতি পাবেন যারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বস্তি-সংকট পাশাপাশি চলে। কখনো জীবনের প্রত্যাশা পূরণ হয়, আবার কখনো প্রার্থনা করেও কাঙ্ক্ষিত বিষয় পাওয়া যায় না। কিন্তু একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, জীবনের কোনো অবস্থাতেই সে তার রবকে ভুলে যায় না। সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং দুঃখে ধৈর্য ধারণ করে। এমন বান্দাদেরই কিয়ামতের দিন বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ أَفْضَلَ عِبَادِ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْحَمَّادُونَ
‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারা, যারা অধিক আল্লাহর প্রশংসাকারী।’ (সহিহুল জামে‘, হাদিস : ১৫৭১; ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৮০৩)
হাদিসে ব্যবহৃত ‘আল-হাম্মাদুন’ (الْحَمَّادُونَ) শব্দটি এসেছে ‘হামদ’ থেকে। এর অর্থ আল্লাহর প্রশংসা করা। ‘হাম্মাদুন’ বলতে এমন বান্দাদের বোঝানো হয়েছে, যারা বারবার ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর প্রশংসা করেন। তাদের জিহ্বায় আল্লাহর প্রশংসা থাকে এবং অন্তরেও থাকে তাঁর নিয়ামতের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা।
পবিত্র কোরআনের সূচনাই হয়েছে আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সব জগতের প্রতিপালক।’ কারণ মানুষের জীবনে যা কিছু নিয়ামত রয়েছে, তার প্রকৃত দাতা আল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১৮)
তবে আল্লাহর শুকরিয়া শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চারণ করার নাম নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে দাউদের পরিবার, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কাজ করো।’ (সুরা সাবা, আয়াত : ১৩) অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও শুকরিয়ার অংশ। সম্পদ পেলে অহংকার না করে তা কল্যাণে ব্যয় করা, জ্ঞান পেলে মানুষের উপকারে তা কাজে লাগানো এবং সুস্থতা পেলে ইবাদত ও সৎকাজে সময় দেওয়া প্রকৃত কৃতজ্ঞতার পরিচয়।
মুমিনের শুকরিয়ার প্রকৃত পরীক্ষা আসে বিপদের সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার সব বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখকর কিছু এলে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্ট এলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনেও কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) রাতে এত অধিক সালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পদযুগল পুলে যেত। আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ্ তো আপনার আগের ও পরের ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? তবু আপনি কেন তা করছেন? তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া পছন্দ করব না? (বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৭)
আজ আমরা অনেক সময় জীবনে যা নেই, তার হিসাব করতে গিয়ে যা পেয়েছি, তা ভুলে যাই। অথচ সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা, জীবিকা, জ্ঞান, সময় এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসই আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মুমিনের জীবনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শুধু একটি বাক্য নয়, বরং একটি জীবনদর্শন।
সুখে শুকরিয়া, দুঃখে সবর, প্রাপ্তিতে বিনয় এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থা একজন মুমিনকে সেই ‘হাম্মাদুন’দের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম।
মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হওয়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক



