মিজানের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী আমল

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজেরই একদিন হিসাব হবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মানুষের আমল মিজানের পাল্লায় ওজন করবেন। সেদিন কেউ তার সম্পদ, বংশ-মর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে সফল হবে না; সফল হবে সে-ই, যার নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বহু ইবাদত রয়েছে, যা মানুষের নাজাতের কারণ। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ গুণকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা মিজানের পাল্লায় অন্য সব আমলের তুলনায় সবচেয়ে ভারী বলে ঘোষণা করেছেন। সেটি হলো উত্তম চরিত্র বা হুসনুল খুলুক।
আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মিজানের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী আর কিছুই নেই।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯৯)
এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি মানুষের চরিত্র গঠনেরও ধর্ম। একজন মুসলিমের ঈমানের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার ব্যবহার, কথা, আচরণ, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, বিনয় ও মানুষের প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে।
মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত : ৪)। এটি এমন একটি প্রশংসা, যা স্বয়ং আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে দিয়েছেন। আবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আগমনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বলেছেন, ‘আমি তো উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ৮৯৫২)
অতএব বোঝা যায় যে, ইসলামের দাওয়াত শুধু আকিদা ও ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং উত্তম চরিত্র গঠনও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সচ্চরিত্র বলতে শুধু হাসিমুখে কথা বলা বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, ধৈর্য, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, গিবত ও অপবাদ থেকে বিরত থাকা, প্রতিবেশীর হক আদায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা। যে ব্যক্তি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অন্যের ভুল ক্ষমা করে, মানুষের উপকার করে এবং কাউকে কষ্ট দেয় না, সে-ই প্রকৃত অর্থে সচ্চরিত্রবান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬৮২)। অর্থাৎ চরিত্রের উৎকর্ষ ঈমানের পরিপূর্ণতারই পরিচায়ক।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে রূঢ় ভাষা, বিদ্বেষ, অপমান, কটূক্তি ও অসহিষ্ণুতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ধর্মীয় পরিচয় বহন করলেও নিজ কথাবার্তা ও আচরণে ইসলামের সেই সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না। অথচ একজন মুসলমানের ভাষা হবে শালীন, আচরণ হবে মার্জিত এবং মতভেদ থাকলেও সে ন্যায় ও সৌজন্য বজায় রাখবে। পবিত্র কোরআন নির্দেশ দিয়েছে যে, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)
সচ্চরিত্র মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার পাশাপাশি সমাজে শান্তি, বিশ্বাস ও সম্প্রীতির ভিত্তিও গড়ে তোলে। একজন সৎ ও ভদ্র ব্যবসায়ীর প্রতি মানুষ আস্থা রাখে, একজন বিনয়ী শিক্ষক শিক্ষার্থীর হৃদয় জয় করেন, একজন ন্যায়পরায়ণ নেতা জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করেন এবং একজন সচ্চরিত্রবান প্রতিবেশী পুরো সমাজকে নিরাপদ করে তোলেন। তাই ইসলামে চরিত্রকে ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং সামাজিক কল্যাণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, মানুষের সৌভাগ্যের অন্যতম কারণ হলো সুন্দর চরিত্র, আর দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ হলো নিকৃষ্ট চরিত্র।
সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, রাগ নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন, কোরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন, সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ এবং প্রতিদিন নিজের আচরণের হিসাব নেওয়া। ছোট ছোট বিষয়েও মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, হাসিমুখে কথা বলা এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়ার চেষ্টা করা একজন মুমিনের দৈনন্দিন আমল হওয়া উচিত।
কিয়ামতের দিন মানুষ যখন তার আমলের হিসাব নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবে, তখন সুন্দর চরিত্র তার নেক আমলের পাল্লাকে ভারী করে দিতে পারে। তাই নামাজ, রোজা, দান-সদকা ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি নিজের চরিত্রকে সুন্দর করা প্রতিটি মুসলমানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণাই আমাদের জন্য যথেষ্ট: মিজানের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী আর কিছুই নেই।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




