জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াতের বিস্ময়কর উপকারিতা

প্রতীকী ছবি
ইসলামে কিছু সময়, কিছু আমল এবং কিছু সূরা এমন রয়েছে, যেগুলো মানুষের আত্মিক জীবনকে বিশেষভাবে আলোকিত করে। জুমার দিন তেমনই এক মর্যাদাপূর্ণ দিন। আর এ দিনের বিশেষ আমলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সুরা কাহাফ তিলাওয়াত। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে এ দিনের জন্য কিছু বিশেষ ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছেন, যার মধ্যে সুরা কাহাফ পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ
‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত নূর আলোকিত করা হবে।’ (সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, হাদিস : ৬২০৯; মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস : ৩৩৯২)
এখানে ‘নূর’ শব্দটি শুধু বাহ্যিক আলো নয়; বরং ঈমান, অন্তর্দৃষ্টি, হিদায়াত, মানসিক প্রশান্তি ও গুনাহ থেকে সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন।
নূরের অর্থ কী
ইমাম নববি (রহ.) ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এ নূর এমন এক আধ্যাত্মিক আলো, যা মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক পথ দেখায় এবং তাকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করে।
পবিত্র কোরআনেমহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ
‘যে ব্যক্তি মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবন দান করেছি এবং তার জন্য এমন নূর দিয়েছি যার দ্বারা সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে…’ (সুরা আনআম, আয়াত :১২২)
অতএব, সুরা কাহাফের নূর মানুষের অন্তরজগতকে উজ্জ্বল করে।
সুরা কাহাফ মানুষকে ফিতনা মোকাবিলার শিক্ষা দেয়
সুরা কাহাফকে শুধু ফজিলতের সূরা হিসেবে দেখলে পূর্ণ উপলব্ধি হয় না। এই সুরাটি মূলত মানুষের জীবনের বড় বড় পরীক্ষার মোকাবিলার শিক্ষা দেয়।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সুরা কাহাফে চার ধরনের বড় ফিতনার দিকনির্দেশনা রয়েছে।
এক. দ্বীনের ফিতনা :সুরাটিতে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ঘটনা দেখায়, ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে মানুষকে পরিবেশের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়।
দুই. সম্পদের ফিতনা : সুরাটিতে আলোচিত দুই বাগানের মালিকের ঘটনা শেখায়, সম্পদ আল্লাহর নিয়ামত, অহংকারের উপকরণ নয়।
তিন. জ্ঞানের ফিতনা : সুরায় উপস্থাপিত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জ্ঞান সীমিত এবং বিনয় জ্ঞানের শর্ত।
চার. ক্ষমতার ফিতনা: সুরায় তুলে ধরা জুলকারনাইনের ঘটনা শেখায়, ক্ষমতা মানুষের সেবা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
এই চার পরীক্ষাই আজকের পৃথিবীতে নতুন রূপে মানুষের সামনে উপস্থিত।
দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার বিশেষ সম্পর্ক
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ
‘যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮০৯) অন্য বর্ণনায় শেষ দশ আয়াতের কথাও এসেছে।
দাজ্জাল শুধু ভবিষ্যতের একটি চরিত্র নয়; তার ফিতনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো বিভ্রান্তি, ভোগবাদ, প্রতারণা ও সত্যকে বিকৃত করা। সুরা কাহাফ মানুষের ভেতরে এমন ঈমানি শক্তি তৈরি করে, যা এসব বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
অন্তরের প্রশান্তি ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম
আজ মানুষ তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও অস্থির। বাহ্যিক উন্নতি বাড়লেও মানসিক শান্তি কমছে। সুরা কাহাফের আয়াতগুলো ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করলে মানুষ উপলব্ধি করে, জীবন শুধু প্রতিযোগিতা নয়; এটি পরীক্ষা, দায়িত্ব ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের পথ।
পবিত্র কোরআন নিজেই ঘোষণা করেছে,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রা'দ, আয়াত : ২৮)
জুমার দিনে কীভাবে এই আমল করা যেতে পারে
জুমার দিনে ফজরের পর, অথবা জুমার আগে বা পরে সুযোগমতো পুরো সুরা তিলাওয়াত করা উত্তম। কেউ আরবি সুন্দরভাবে না পড়তে পারলে ধীরে ধীরে শিখে নেওয়া, অর্থ পড়া এবং আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করা উপকারী।
আলেমদের একটি বড় অংশের মতে, বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এ আমল করা যায়।
জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত শুধু একটি সাপ্তাহিক আমল নয়; এটি ঈমান নবায়নের একটি আধ্যাত্মিক কর্মসূচি। এক সপ্তাহের ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, ব্যস্ততা ও গুনাহের ধুলো মুছে মানুষকে নতুন আলোয় এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ।
যে ব্যক্তি নিয়মিত জুমার দিনে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করে, সে শুধু একটি ফজিলতের আমলই করে না; বরং নিজের হৃদয়ে এমন এক নূর জ্বালিয়ে রাখে, যা তাকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত আল্লাহর পথে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




