হিরাক্লিয়াসের দরবারে মহানবী (সা.)-এর চিঠি

সংগৃহীত ছবি
খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী। আরবের মরুভূমি থেকে উচ্চারিত হচ্ছে এক নতুন আহ্বান। আহ্বানটি কোনো ভূখণ্ড, গোত্র কিংবা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই আহ্বানে এক আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ঈমানের দিকে মানুষকে ডাকা হচ্ছে।
ইসলামের এই ডাক মক্কার সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের ভিভিন্ন প্রান্তে এগিয়ে যাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক ও রাজাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। সেগুলোর একটি হচ্ছে তৎকালীন পরাশক্তি বাইজেন্টাইন রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে পাঠানো চিঠি। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় সহিহ বুখারির ৭ নম্বর হাদিসে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পত্র নিয়ে দিহইয়া আল-কালবি (রা.) হিরাক্লিয়াসের কাছে যান। চিঠিতে ছিল আল্লাহর নামে শুরু করে ইসলামের প্রতি আহ্বান। তাতে বলা হয়েছিল,
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে রোমের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যারা সঠিক পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতি সালাম। এরপর, আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন এবং আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন।’
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করেন:
‘হে কিতাবধারীগণ! এসো সেই কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন—আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের কেউ কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৬৪)
চিঠিটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার বক্তব্য ছিল গভীর। কোনো রাজনৈতিক জোটের প্রস্তাব নয়, কোনো সামরিক হুমকি নয়, কোনো পার্থিব সুবিধার প্রতিশ্রুতিও নয়। বরং একজন নবীর পক্ষ থেকে একজন সম্রাটের প্রতি সত্যের আহ্বান।
হিরাক্লিয়াস চিঠিটি পেয়েই বিষয়টি উপেক্ষা করেননি। তখন তিনি শাম অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। এ সময় আবু সুফিয়ান (রা.), যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি, কুরাইশের একটি বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
হিরাক্লিয়াস তার লোকদের নির্দেশ দিলেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের কোনো ব্যক্তি থাকলে তাকে তার সামনে নিয়ে আসতে। তখন আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের তার সামনে হাজির করা হলো।
সম্রাট তাদের বললেন, তিনি মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করবেন। আবু সুফিয়ান যদি কোনো প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বলেন, তার সঙ্গীরা যেন তা সংশোধন করেন।
আবু সুফিয়ান পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, তিনি যদি মিথ্যা বলার সুযোগ পেতেন, তবে অবশ্যই মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলতেন। কিন্তু তার সঙ্গীরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি সত্য কথাই বলেছিলেন। (বুখারি, হাদিস: ৭)
হিরাক্লিয়াসের প্রথম প্রশ্নগুলোর একটি ছিল, মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশ কেমন?
আবু সুফিয়ান জানালেন, তিনি সম্মানিত বংশের মানুষ।
এরপর প্রশ্ন করলেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি রাজা ছিলেন?
উত্তর ছিল, না।
হিরাক্লিয়াস জানতে চাইলেন, তাঁর অনুসারীরা সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষ, নাকি অভিজাতরা?
আবু সুফিয়ান বললেন, মূলত দুর্বল ও সাধারণ মানুষই তাঁর অনুসরণ করছে।
এরপর জানতে চাওয়া হলো, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে, না কমছে?
উত্তর এলো, বাড়ছে।
হিরাক্লিয়াস আরও জানতে চাইলেন, তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করার পর কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে ধর্মত্যাগ করেছে?
আবু সুফিয়ান বললেন, না।
তারপর প্রশ্ন হলো, মুহাম্মদ (সা.) কি কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন?
আবু সুফিয়ান বললেন, এখন পর্যন্ত না। তবে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে, সেটির ভবিষ্যৎ কী হয়, তা তারা জানেন না।
হিরাক্লিয়াস আরও জানতে চাইলেন, তাদের মধ্যে যুদ্ধ হলে ফলাফল কী হয়?
আবু সুফিয়ান বললেন, কখনো তারা জয়ী হন, কখনো মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীরা জয়ী হন।
হিরাক্লিয়াস এরপর মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্র ও তাঁর দাওয়াতের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও প্রশ্ন করেন।
প্রশ্নগুলোর ধরন ছিল এমন, যেন একজন শাসকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নয়, বরং একজন নবীর সত্যতা যাচাইয়ের অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
হিরাক্লিয়াসের ঐতিহাসিক মন্তব্য
আবু সুফিয়ানের উত্তরগুলো শোনার পর হিরাক্লিয়াস বললেন, যদি তাঁর সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সত্য হয়, তবে তিনি অবশ্যই নবী।
এরপর তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশমর্যাদা, তাঁর সত্যবাদিতা, অনুসারীদের বৃদ্ধি এবং পূর্ববর্তী নবীদের দাওয়াতের ধারাবাহিকতার সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে দেখেন।
হিরাক্লিয়াস বলেছিলেন,
‘আমি জানতাম, তিনি আবির্ভূত হবেন; কিন্তু আমি জানতাম না যে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন।’ তিনি আরও বলেন, যদি তিনি জানতেন যে তাঁর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে, তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কষ্ট স্বীকার করতেন। তাঁর কাছে পৌঁছতে পারলে তিনি তাঁর পা ধুয়ে দিতেন। (বুখারি, হাদিস: ৭)
এখানে ইতিহাসের এক বিস্ময়কর মুহূর্ত তৈরি হয়।
একদিকে আরবের এক নবী, যাঁর হাতে কোনো সাম্রাজ্য নেই। অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের সম্রাট। অথচ একজন সম্রাট তাঁর সত্যতার সম্ভাবনাকে এত গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন।
তবু শেষ পর্যন্ত হিরাক্লিয়াস ইসলাম গ্রহণ করেননি।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তিনি যখন তার রাজ্যের প্রধান ব্যক্তিদের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন, তখন তারা তার কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ল এবং দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল। পরিস্থিতি দেখে তিনি বুঝলেন, তার অনুসারীরা ইসলাম গ্রহণের আহ্বান মেনে নেবে না।
এরপর তিনি তাদের বললেন, তিনি তাদের ধর্মের ব্যাপারে পরীক্ষা করছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাদের দৃঢ়তা যাচাই করা। শেষ পর্যন্ত তারা তার সামনে নত হলো।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের একটি গভীর দুর্বলতা সামনে আসে। সত্যকে চিনে ফেলা আর সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা সব সময় এক বিষয় নয়।
মানুষ কখনো সত্যের লক্ষণ দেখতে পায়, সত্যের কথা উপলব্ধি করে, এমনকি অন্তরেও তার প্রভাব অনুভব করে। কিন্তু সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতা, স্বার্থ কিংবা পরিণতির ভয় তাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়।
আজ হিরাক্লিয়াসের বিশাল সাম্রাজ্য নেই। তার প্রাসাদও নেই সেই জৌলুশে। সময়ের স্রোতে পৃথিবীর কত রাজ্য এসেছে, কত সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে।
কিন্তু সেই চিঠির আহ্বান এখনো জীবিত।
শত শত বছর পেরিয়ে গেছে। পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে। রাজা-সম্রাটদের নাম ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়েছে। অথচ মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই আহ্বান আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ঈমানের অংশ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক








