নবীজীবনের বাঁকে বাঁকে
মহানবী (সা.)-এর বংশপরিচয় : কেন আল্লাহ তাঁকে এই বংশেই জন্ম দিলেন?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন ও কর্মকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাঁর বংশপরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জানা জরুরি। ইসলাম বংশগৌরবকে মানুষের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)। তবুও আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ নবীকে এমন একটি সম্মানিত পরিবারে জন্ম দিয়েছেন, যা মানুষের কাছে তাঁর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ার ফল
মহানবী (সা.)-এর বংশধারা ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে। কাবা নির্মাণের পর ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসূল পাঠান, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৯)
মহানবী (সা.) নিজেও বলেছেন, ‘আমি আমার পিতা ইবরাহিমের দোয়ার ফল।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৭১৬৩)
অতএব, তাঁর আগমন ছিল বহু শতাব্দী আগে করা এক নবীর দোয়ার বাস্তবায়ন।
কুরাইশ আরবের সর্বাধিক সম্মানিত গোত্র
মহানবী (সা.) কুরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। কাবা শরিফের তত্ত্বাবধান, হাজিদের সেবা এবং মক্কার নেতৃত্বের কারণে কুরাইশ গোত্র সমগ্র আরবে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল।
ইবন হিশাম ও ইবন কাসির উল্লেখ করেছেন, কুরাইশদের এই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, আরবরা তাঁর বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
কুরাইশের মধ্যেও বনি হাশিম ছিল অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন শাখা। মহানবী (সা.)-এর প্রপিতামহ হাশিম ইবন আবদে মানাফ হাজিদের খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা করতেন। তাঁর উদারতা ও নেতৃত্বের জন্য তিনি আরবজুড়ে পরিচিত ছিলেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ইসমাঈলের সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানাকে নির্বাচন করেছেন, কিনানার মধ্য থেকে কুরাইশকে, কুরাইশের মধ্য থেকে বনি হাশিমকে এবং বনি হাশিমের মধ্য থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২২৭৬)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর নির্বাচন ছিল উদ্দেশ্যমূলক এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ।
পিতা আবদুল্লাহ অকালপ্রয়াত এক সজ্জন
মহানবী (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সৎ, ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর জন্মের আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবন ইসহাক ও ইবন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যবসায়িক সফর শেষে মদিনা থেকে ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যাতে মহানবী (সা.) জন্মের আগেই পিতৃহীন হয়ে যান। পরবর্তীকালে কোরআন এ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা আদ-দুহা, আয়াত : ৬)
মাতা আমিনা (রা.) পবিত্রতার প্রতীক
মহানবী (সা.)-এর মাতা আমিনা বিনতে ওহাব ছিলেন বনি জুহরা গোত্রের সম্মানিত নারী। তিনি ছিলেন চরিত্রবান ও মর্যাদাশীল।
মহানবী (সা.)-এর জন্মের কিছু বছর পর, যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর, তখন মদিনা থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে আমিনা (রা.) ইন্তেকাল করেন (বুখারি, হাদিস: ১৩৫১-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; সীরাত ইবন হিশাম)।
এভাবে তিনি খুব অল্প বয়সেই মাতৃহীনও হয়ে যান।
দাদা আবদুল মুত্তালিবের স্নেহ
মাতার মৃত্যুর পর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নেন। সীরাতের বর্ণনায় এসেছে, কাবার পাশে আবদুল মুত্তালিবের জন্য নির্ধারিত আসনে অন্য কাউকে বসতে দেওয়া হতো না। কিন্তু ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.) সেখানে বসলে তিনি তাঁকে স্নেহভরে পাশে বসিয়ে রাখতেন এবং বলতেন, ‘আমার এই নাতির ভবিষ্যৎ খুবই মহান হবে।’ (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ)
যদিও এই উক্তির সনদ সহিহ হাদিসের পর্যায়ের নয়, তবে এটি সীরাতগ্রন্থে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা।
আল্লাহর প্রজ্ঞা
কেন মহানবী (সা.)-কে এতিম অবস্থায় বড় করা হলো?
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, এর মধ্যে বহু প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। যেন কেউ বলতে না পারে যে, তিনি পারিবারিক ক্ষমতা, সম্পদ বা পিতার প্রভাবের কারণে নেতৃত্ব লাভ করেছেন। বরং তাঁর প্রতিটি সাফল্য ছিল আল্লাহর সাহায্য, তাঁর চরিত্র এবং তাঁর নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ।
মোটকথা মহানবী (সা.)-এর বংশপরিচয় ছিল সম্মানিত, কিন্তু তাঁর জীবনের সূচনা ছিল পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও শৈশব থেকেই এতিমত্ব, দারিদ্র্য এবং সংগ্রামের স্বাদ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যাতে তিনি সমাজের দুর্বল, এতিম, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। তাঁর বংশ তাঁকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল, আর তাঁর চরিত্র তাঁকে বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শে পরিণত করেছিল।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)






