নবীজীবনের বাঁকে বাঁকে
মহানবী (সা.)-এর জন্মের পূর্বে আরব সমাজ: ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মহানবী (সা.)-এর জন্মের পূর্বে আরব সমাজ: ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মের আগে আরব উপদ্বীপ ছিল বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোমান ও পারস্যের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি কোনো একক রাষ্ট্রের অধীনে ছিল না। বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত আরব সমাজে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মানদণ্ড, আর বংশগৌরব ছিল পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। তবু এই সমাজে কিছু ইতিবাচক গুণও ছিল, যেমন অতিথিপরায়ণতা, সাহসিকতা, অঙ্গীকার রক্ষা এবং কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগ। এসব গুণ ও দোষ মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল মহানবী (সা.)-এর আগমনের পূর্ববর্তী আরবের বাস্তব চিত্র।
আরবের ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্য
আরব উপদ্বীপ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ইয়েমেন থেকে সুগন্ধি দ্রব্য, ভারত থেকে মসলা এবং সিরিয়া থেকে বিভিন্ন বিলাসপণ্য আরবের বাজারে আসত।
কুরাইশ গোত্রের ব্যবসায়ীরা শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্য সফরে যেতেন। পবিত্র কোরআন এ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে, ‘কুরাইশদের অভ্যাসের কারণে, তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের অভ্যাসের কারণে...’ (সুরা কুরাইশ, আয়াত : ১-২)
ইবন কাসির (রহ.) তার তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, এই বাণিজ্যই কুরাইশদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি ছিল।
গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা
আরব সমাজে রাষ্ট্রের পরিবর্তে গোত্রই ছিল নিরাপত্তা ও পরিচয়ের কেন্দ্র। একজন ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারিত হতো তার গোত্রের শক্তি দ্বারা।
ইবন খালদুন তার আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে লিখেছেন, আরবদের সামাজিক সংহতির মূল শক্তি ছিল ‘আসাবিয়্যাহ’ বা গোত্রীয় সংহতি। কিন্তু এই সংহতিই অনেক সময় অন্ধ পক্ষপাতিত্বে রূপ নিত। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলেও শুধু গোত্রের সদস্য হওয়ার কারণে তাকে সমর্থন করা হতো।
পরবর্তীকালে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গোত্রবাদ বা অন্ধ জাতিগত পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২১)
তৎকালীন আরবের ধর্মীয় অবস্থা
হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর প্রতিষ্ঠিত তাওহিদের শিক্ষা সময়ের প্রবাহে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। আমর ইবনু ‘আমির খুযআহ প্রথম আরবে প্রকাশ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন করেছিল। সহিহ বুখারিতে এসেছে- আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি ‘আমর ইবনু ‘আমির খুযআহকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সায়্যিবাহ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে। বলে ইমাম বুখারি (বুখারি, হাদিস: ৩৫২১) সীরাতগ্রন্থগুলোতেও অনরূপ ভাষ্য উল্লেখ রয়েছে।
কাবা শরিফে তখন ৩৬০টিরও বেশি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ)। হুবাল, লাত, উজ্জা ও মানাত ছিল প্রধান উপাস্য।
তবে সবাই মূর্তিপূজক ছিলেন না। কিছু মানুষ, যাদের `হানিফ' বলা হতো, তারা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বিশুদ্ধ তাওহিদের অনুসারী ছিলেন। ওয়ারাকা ইবন নওফল, যায়েদ ইবন আমর ইবন নুফাইল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কাবা শরিফের মর্যাদা
মূর্তিপূজা প্রচলিত হলেও কাবা শরিফ আরবদের কাছে সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান ছিল। প্রতিবছর আরবের বিভিন্ন গোত্র সেখানে হজ পালন, ব্যবসা ও কবিতা প্রতিযোগিতার জন্য সমবেত হতো।
মক্কার উকাজ মেলা ছিল আরবের সাহিত্য ও বাণিজ্যের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র।মু'আল্লাকাত নামে পরিচিত বিখ্যাত কবিদের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা মতো ঐতিহ্যে তারা লালন করবো। যার বিবরণ আরবি সাহিত্যগ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়
গোত্রগত সংঘর্ষের পাশাপাশি সমাজে মদ্যপান, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার এবং প্রতিশোধের সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। একটি হত্যার প্রতিশোধ নিতে কখনো কখনো বহু বছর ধরে যুদ্ধ চলত।
ড. শওকি আবু খলিল তার Atlas of the Prophet's Biography-এ উল্লেখ করেন, আরব সমাজে রক্তের প্রতিশোধ ছিল সামাজিক মর্যাদার অংশ।
ইসলাম এসে ঘোষণা করে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)
কিছু মহৎ গুণও
ছিল
জাহেলিয়াতের যুগ মানেই সবকিছু অন্ধকার ছিল এমন নয়। আরবদের মধ্যে এমন কিছু গুণ ছিল, যেগুলো ইসলাম সংরক্ষণ ও পরিশুদ্ধ করেছে।
তারা অতিথিপরায়ণ ছিল, অঙ্গীকার রক্ষা করত, সাহসী ছিল এবং কবিতা ও ভাষাচর্চায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিল। মহানবী (সা.) নিজেও হিলফুল ফুযূল নামে একটি ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে তিনি বলেন, ‘আজও যদি আমাকে এমন একটি চুক্তির জন্য আহ্বান করা হয়, আমি অবশ্যই তাতে সাড়া দেব।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৬৫৫)
এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম জাহেলিয়াতের সবকিছু বাতিল করেনি; বরং ভালো গুণগুলোকে আরও পরিশুদ্ধ ও বিকশিত করেছে।
মোট কথা মহানবী (সা.)-এর জন্মের পূর্ববর্তী আরব সমাজ ছিল বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে বংশগৌরব, মূর্তিপূজা, সামাজিক অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয়; অন্যদিকে ভাষার উৎকর্ষ, অতিথিপরায়ণতা এবং সাহসিকতার মতো কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তাআলা এই সমাজ থেকেই এমন একজন নবীকে মনোনীত করলেন, যিনি একই সঙ্গে আরবকে এবং সমগ্র মানবজাতিকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের, বিভক্তি থেকে ঐক্যের এবং অন্যায় থেকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করলেন।
(চলবে, ইনশাআল্লাহ)




