নবীজীবনের বাঁকে বাঁকে
মহানবী (সা.)-এর জন্মলগ্নের অলৌকিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক বর্ণনা

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। তাঁর আগমনের মাধ্যমে শুধু আরব উপদ্বীপের নয়, সমগ্র বিশ্বের ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্মকে কেন্দ্র করে সীরাত, ইতিহাস, দালায়িল বা নবুওয়তের নিদর্শনবিষয়ক গ্রন্থে নানা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা যেমন ঈমানের অংশ, তেমনি তাঁর জীবনের ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠা ও দলিলের প্রতি সতর্কতাও ইসলামের শিক্ষা।
মহানবী (সা.)-এর জন্মলগ্নের ঘটনাগুলো আলোচনার সময় সব বর্ণনাকে একই মানদণ্ডে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কারণ কোনো ঘটনা সহিহ হাদিসে প্রতিষ্ঠিত, কোনোটি গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এসেছে, আবার কোনোটি দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল।
মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও পূর্ববর্তী নবীদের দোয়া-সুসংবাদের বাস্তবায়ন
মহানবী (সা.) নিজেই তাঁর আগমন সম্পর্কে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন: ‘আমি আমার পিতা ইবরাহিমের দোয়া, ঈসার সুসংবাদ; আর আমার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁর থেকে এমন এক নূর বের হয়েছে, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছে।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৭১৬৩)
এই হাদিস মহানবী (সা.)-এর আগমনকে পূর্ববর্তী নবীদের মিশনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া
পবিত্র কোরআনে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর দোয়া বর্ণিত হয়েছে: ‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্য থেকে তাদের জন্য একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯)
অনেক মুফাসসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ইবরাহিম (আ.)-এর এই দোয়ার পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেছে তাঁর বংশধর মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। কারণ তিনি ইসমাঈল (আ.)-এর বংশ থেকে আগত এবং তাঁর মাধ্যমে কাবাকেন্দ্রিক আরব সমাজে তাওহিদের নবায়ন ঘটে।
ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ
ঈসা (আ.)-ও তাঁর পরবর্তী একজন রাসুলের আগমনের সংবাদ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘আর স্মরণ করো, যখন মারইয়ামপুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে বনি ইসরাঈল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল, আমার পূর্বে আগত তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আগমনকারী একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা, যার নাম আহমাদ।’ (সুরা সফ, আয়াত: ৬)
মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায় ‘আহমাদ’ মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম নাম। ফলে তাঁর নিজের বক্তব্য, ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া এবং ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
হাতির ঘটনার বছরে জন্ম
অধিকাংশ সীরাত ও ইতিহাসবিদের মতে, মহানবী (সা.) আমুল ফীল, অর্থাৎ হাতির ঘটনার বছর জন্মগ্রহণ করেন। ইবন ইসহাক, ইবন হিশাম, ইবন কাসিরসহ বহু সীরাতবিদ এ মত উল্লেখ করেছেন। (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ; ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
হাতির ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের শাসক আবরাহা আরবদের কাবামুখী ধর্মীয় কেন্দ্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়েছিল। তার বাহিনীতে হাতি থাকায় ঘটনাটি ‘হাতির ঘটনা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাবাঘরকে রক্ষা করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘আপনি কি দেখেননি, আপনার রব হাতিওয়ালাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? আর তিনি তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেছিলেন, যারা তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করছিল। অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত খড়কুটোর মতো করে দিয়েছিলেন।’ (সুরা ফীল, আয়াত: ১-৫)
হাতির ঘটনা কেবল একটি সামরিক ব্যর্থতার ইতিহাস নয়। মুসলিম ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে এটি ছিল কাবাঘরের প্রতি আল্লাহর বিশেষ হেফাজতের নিদর্শন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পবিত্র নগরীতেই জন্ম নিলেন শেষ নবী।
তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মহানবী (সা.)-এর জন্মের সুনির্দিষ্ট খ্রিষ্টীয় সাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত হিসাবে ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ বলা হলেও হিজরি-পূর্ব আরব ও পারস্যের সালপঞ্জি এবং হাতির ঘটনার সঠিক সময় নির্ধারণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নতা আছে।
মহানবী (সা.)-এর জন্মের দিন ও তারিখ
মহানবী (সা.)-এর জন্মের দিন সম্পর্কে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো সোমবার।
আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: ‘এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
অতএব, সোমবার তাঁর জন্মের দিন হওয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ২ রবিউল আউয়াল, ৮ রবিউল আউয়াল, ৯ রবিউল আউয়াল, ১০ রবিউল আউয়াল এবং ১২ রবিউল আউয়ালের মতো বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হলেও সহিহ হাদিস দ্বারা এটি নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়।
ইবন কাসিরসহ অনেক ইতিহাসবিদ বিভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যাগত গবেষণার ভিত্তিতে কেউ কেউ ৯ রবিউল আউয়ালের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই।
তাই বলা যায়, সোমবার তাঁর জন্মের দিন হওয়ার বিষয়টি শক্তিশালী সূত্রে প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু রবিউল আউয়ালের নির্দিষ্ট তারিখটি মতভেদপূর্ণ।
মায়ের দেখা নূর
মহানবী (সা.)-এর জন্মলগ্নের অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বর্ণনাগুলোর একটি হলো তাঁর মা আমিনা বিনতে ওয়াহবের দেখা নূরের ঘটনা।
উল্লেখিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁর মা এমন এক নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছিল। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৭১৬৩)
এ বর্ণনাকে অনেক আলেম নবুওয়তের আগমনের একটি পূর্বলক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘সিরিয়ার প্রাসাদ আলোকিত হওয়া’কে কেউ কেউ ইসলামের ভবিষ্যৎ বিস্তার এবং শাম অঞ্চলে ইসলামের প্রতিষ্ঠার প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবেও দেখেছেন।
এখানে লক্ষণীয়, হাদিসে আমিনা (রা.)-এর দেখা নূরের কথা আছে; কিন্তু পরবর্তী যুগের কিছু কাহিনিতে নবীজির জন্মের সময় গোটা পৃথিবী আলোকিত হয়ে যাওয়া, মক্কার প্রতিটি ঘরে আলো পৌঁছে যাওয়া ইত্যাদি যে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, তার সবগুলোর সনদ একই পর্যায়ের নয়। তাই মূল হাদিসে যতটুকু আছে ততটুকু বলাই উত্তম।
কিসরার প্রাসাদ কেঁপে ওঠা ও চৌদ্দটি বারান্দা ভেঙে পড়া
সীরাতগ্রন্থে একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা হলো, মহানবী (সা.)-এর জন্মের রাতে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রাসাদ কেঁপে ওঠে এবং তার চৌদ্দটি বারান্দা বা মিনার ভেঙে পড়ে।
এ বর্ণনা ইমাম বাইহাকির দালায়িলুন নুবুওয়াহসহ পরবর্তী কয়েকটি গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইবন কাসিরও তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে জন্মলগ্নের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করেছেন।
তবে হাদিসবিশারদদের একটি অংশ এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আপত্তি করেছেন। ফলে একে সহিহ হাদিসের মতো নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা যথাযথ নয়।
তবে ইসলামী ইতিহাসের একটি বর্ণনা হিসেবে এর প্রতীকী তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পারস্য ছিল সে সময়কার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য। অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই ইসলামের বার্তা সেই সাম্রাজ্যের গভীরে পৌঁছে যায় এবং সাসানীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।
কিন্তু এই পরবর্তী ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে জন্মরাতের প্রাসাদ ধসের ঘটনাকে যুক্ত করে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে উপস্থাপন করার আগে অবশ্যই এর দুর্বল সনদের বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে।
পারস্যের অগ্নিকুণ্ড নিভে যাওয়ার বর্ণনা
আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা হলো, মহানবী (সা.)-এর জন্মের রাতে পারস্যের একটি অগ্নিকুণ্ড, যা দীর্ঘকাল ধরে জ্বলছিল, তা হঠাৎ নিভে যায়।
এ বর্ণনাটিও দালায়িলুন নুবুওয়াহ এবং কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে এর সনদ সহিহ হাদিসের পর্যায়ের নয়।
পারস্যের সে চলমান ধর্মে আগুন ছিল বিশেষ ধর্মীয় প্রতীকের বিষয়। তাই পরবর্তী যুগের লেখকেরা অগ্নিকুণ্ড নিভে যাওয়ার ঘটনাকে একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, তাওহিদের আলো বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রাচীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে, এ ঘটনার মধ্যে তার ইঙ্গিত ছিল।
কিন্তু গবেষণার দৃষ্টিতে বলতে গেলে আমরা বলতে পারি, এটি একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা, কিন্তু সহিহ হাদিস দ্বারা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা নয়।
সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.)-এর জন্মের রাতে পারস্যে সাওয়া নামের একটি হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়।
কিছু সীরাত ও দালায়িলগ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া গেলেও নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ নেই। ফলে এ বিষয়ে একই সতর্কতা প্রযোজ্য।
ইতিহাসের আলোচনায় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রাচীন যুগে কোনো মহান ব্যক্তির জন্মকে কেন্দ্র করে পরবর্তী প্রজন্ম প্রায়ই বিভিন্ন অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত করেছে। ইসলামী গবেষণার শক্তি এখানেই যে, মুসলিম মুহাদ্দিসগণ শুধু কোনো ঘটনা সুন্দর বা আবেগপূর্ণ হওয়ার কারণে তা গ্রহণ করেননি; বরং বর্ণনাকারীর পরিচয়, স্মরণশক্তি, সত্যবাদিতা এবং সনদের ধারাবাহিকতা যাচাই করেছেন।
তাই মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্বল বর্ণনার ওপর নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর সহিহ হাদিসে প্রমাণিত জীবন, কোরআন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত পরিবর্তনই তাঁর সত্যতার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী দলিল।
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবে শেষ নবীর আগমনের সংবাদ
পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে মহানবী (সা.)-এর আগমনের সংবাদ ছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন: ‘যারা সেই রাসূলের অনুসরণ করে, যিনি নিরক্ষর নবী, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে: ‘যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে এমনভাবে চেনে, যেমন তারা নিজেদের সন্তানদের চেনে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৬)
এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, মহানবী (সা.)-এর আগমন পূর্ববর্তী নবীদের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন নবুওয়তের সেই দীর্ঘ স্রোতের সর্বশেষ নবী।
তাঁর আগমনের অপেক্ষা শুধু মুসলিম ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নবী ও প্রতিশ্রুত ব্যক্তিত্বের ধারণা ছিল। কোরআন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, আহলে কিতাবের একাংশ তাঁকে তাঁর বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিনতে পারত।
জাহেলি যুগের অন্ধকারে নতুন আলোর প্রয়োজন
মহানবী (সা.)-এর জন্মের তাৎপর্য বোঝার জন্য তাঁর জন্মের সময়কার পৃথিবীর অবস্থা জানা জরুরি।
আরব সমাজে গোত্রীয় সংঘাত, রক্তের প্রতিশোধ, দুর্বলের ওপর শক্তিশালীর অত্যাচার, সুদ, মদ্যপান এবং সামাজিক বৈষম্যের ব্যাপকতা ছিল। নারীর মর্যাদা বহু ক্ষেত্রে ক্ষুণ্ন ছিল এবং কোনো কোনো গোত্রে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও চালু ছিল। পবিত্র কোরআন সেই দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: ‘আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা আত-তাকভীর, আয়াত: ৮-৯)
তবে পুরো আরব সমাজকে শুধু অন্ধকারের সমাজ হিসেবে চিত্রিত করাও ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ নয়। আরবদের মধ্যে বীরত্ব, অতিথিপরায়ণতা, কবিতা, বাগ্মিতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতো গুণও ছিল। কিন্তু এসব গুণকে পরিচালিত করার জন্য একটি সুসংহত নৈতিক ও তাওহিদভিত্তিক জীবনদর্শনের প্রয়োজন ছিল।
মহানবী (সা.)-এর আগমন সেই প্রয়োজনের উত্তর হয়ে আসে।
পবিত্র কোরআনই সবচেয়ে বড় নিদর্শন
মহানবী (সা.)-এর জন্মকে ঘিরে প্রাসাদ ভেঙে পড়া, আগুন নিভে যাওয়া বা হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার মতো নানা বর্ণনা থাকলেও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সর্বজনস্বীকৃত অলৌকিক নিদর্শন হলো তাঁর ওপর নাজিল হওয়া পবিত্র কোরআন।
মহান আল্লাহ নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন: ‘তারা কি বলে, সে নিজে এটি রচনা করেছে? বলুন, তবে তোমরা এর মতো একটি সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো তাকে ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৩৮)
মহানবী (সা.)-এর চরিত্রও ছিল তাঁর সত্যতার জীবন্ত দলিল। তাঁর নবুওয়তের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে জানত। এমনকি যারা পরে তাঁর বিরোধিতা করেছে, তাদের অনেকেও তাঁর ব্যক্তিগত সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা নিয়ে অভিযোগ তুলতে পারেনি।
আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত: ৪)
মাত্র তেইশ বছরের নবুওয়তি জীবনে তিনি একটি গোত্রভিত্তিক বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে এমন এক আদর্শের অধীনে একত্রিত করেন, যার ভিত্তি ছিল তাওহিদ, জ্ঞান, ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা ও জবাবদিহি।
দাসকে ভাই বলা, নারীর অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া, এতিমের সম্পদ রক্ষার নির্দেশ, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সুদকে নৈতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শাসককেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা, এসব পরিবর্তন শুধু ধর্মীয় আচারের পরিবর্তন ছিল না। এগুলো একটি নতুন নৈতিক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
সত্যের আলো
মহানবী (সা.)-এর জন্মলগ্নকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সব অলৌকিক বর্ণনা একই মাত্রায় প্রামাণ্য নয়। তাই বর্ণনাগুলোকে কয়েকটি স্তরে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, সহিহ বা হাসান সূত্রে প্রমাণিত বিষয়গুলো দৃঢ়তার সঙ্গে উপস্থাপন করা যায়। যেমন সোমবার তাঁর জন্মের দিন হওয়া এবং তাঁর মা আমিনা (রা.)-এর দেখা নূরের বর্ণনা।
দ্বিতীয়ত, আমুল ফীলের বছরে তাঁর জন্মের বিষয়টি সীরাত ও ইতিহাসের বহু প্রাচীন সূত্রে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।
তৃতীয়ত, কিসরার প্রাসাদ ভেঙে পড়া, পারস্যের অগ্নিকুণ্ড নিভে যাওয়া এবং সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে ঐতিহাসিক বা সীরাতের বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, কিন্তু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা প্রমাণের জন্য দুর্বল কাহিনির প্রয়োজন নেই। তাঁর জন্মের প্রকৃত মহিমা হলো, তিনি এমন এক পৃথিবীতে এসেছিলেন, যেখানে মানবতা পথ হারিয়েছিল। আর তাঁর মাধ্যমেই মহান আল্লাহ মানবজাতিকে দিয়েছেন তাওহিদের বার্তা, ন্যায়বিচারের শিক্ষা, জ্ঞানের আলো, দুর্বলের অধিকার, নারীর মর্যাদা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন নৈতিক ভিত্তি।
কাজেই বলা যায়, তাঁর জন্মের রাতে কোনো প্রাসাদের চৌদ্দটি বারান্দা ভেঙেছিল কি না, কোনো অগ্নিকুণ্ড নিভেছিল কি না বা কোনো হ্রদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও তাঁর জন্মের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা তো অন্যত্র। কারণ তিনি এসেছিলেন অন্ধকারে নিমজ্জিত পৃথিবীকে এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করতে।
সেই আলো শুধু একটি জাতিকে নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আইন, নৈতিকতা ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। আর এ কারণেই মহানবী (সা.)-এর জন্ম শুধু একজন মহাপুরুষের জন্মদিন নয়, মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের এক মহাসন্ধিক্ষণ।




