নবীজি (সা.)-এর হাসি, রসবোধ ও প্রাণবন্ততা

সংগৃহীত ছবি
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আমরা সাধারণত একজন মহান রাসুল, আদর্শ নেতা ও মানবতার পথপ্রদর্শক হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি কোমল ও আকর্ষণীয় দিক ছিল হাসি, রসবোধ ও প্রাণবন্ততা। তিনি যেমন ছিলেন গভীর চিন্তাশীল, ইবাদতে নিমগ্ন এবং দায়িত্বে অবিচল; তেমনি ছিলেন সাহাবিদের সদা হাস্যোজ্জ্বল, নানান বৈধ রসিকতায় প্রফুল্ল করে রাখতেন সঙ্গিদের মন। তবে তাঁর রসবোধ কখনো অশালীনতা, মিথ্যা বা কাউকে অপমান করার উপায় হয়ে ওঠেনি।
আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কি ঘরে হাসতেন?’ তিনি বলেন,
مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مُسْتَجْمِعًا قَطُّ ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ.
‘আমি তাঁর মুখমণ্ডল কখনো অট্টহাসিতে খোলা দেখিনি যাতে আলা জিহ্বা দেখা যায়; বরং তিনি মুচকি হাসতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৯২) তাঁর হাসি ছিল সংযত, সৌম্য ও স্বাভাবিক। তিনি আনন্দ প্রকাশ করতেন, কিন্তু শালীনতার সীমা অতিক্রম করতেন না।
জারির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে তাঁর নিকট প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন তখন তিনি মুচকি হাসতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৩০৩৫) একজন মানুষের প্রতি বারবার হাসিমুখে তাকানো যে কত গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, এই বর্ণনা তার সুন্দর উদাহরণ। তাঁর হাসি ছিল মানুষের প্রতি স্বীকৃতি ও আন্তরিকতার ভাষা।
নবীজি (সা.)-এর রসবোধের একটি বিখ্যাত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আনাস (রা.)-এর বর্ণনায়। সুনানে আবু দাউদে হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে-
أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، احْمِلْنِي، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ قَالَ: وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَهَلْ تَلِدُ الْإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ
‘একদা এক লোক নবী (সা.)-এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে একটা আরোহীর ব্যবস্থা করে দিন। নবী (সা.) বললেন, আমি তোমাকে আরোহণের জন্য একটা উষ্ট্রীর বাচ্চা দিবো। লোকটি বললো, উষ্ট্রীর বাচ্চা দিয়ে আমি কি করবো? নবী (সা.) বললেন, উটকে তো উষ্ট্রীই জন্ম দেয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৮)
রসিকতার মধ্যেও এখানে সত্যের প্রতি তাঁর সতর্কতা লক্ষণীয়। তিনি এমন কোনো কথা বলতেন না যা প্রতারণা বা মিথ্যার পর্যায়ে পড়ে। তিনি নিজেই বলেছেন,
إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا
‘আমি রসিকতা করলেও সত্য ছাড়া কিছু বলি না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯০)
আরেকটি ঘটনায় এক বৃদ্ধা নারী তাঁর কাছে জান্নাতে প্রবেশের জন্য দোয়া চাইলে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘কোনো বৃদ্ধা নারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ কথাটি শুনে নারীটি দুঃখ পেলে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে আল্লাহ জান্নাতবাসীদের নতুন রূপে সৃষ্টি করবেন। এরপর তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত পাঠ করেন,
إِنَّآ أَنشَأْنَـٰهُنَّ إِنشَآءً
‘আমি তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত : ৩৫)
এই ঘটনাগুলো দেখায়, তাঁর রসবোধ ছিল মানুষের মন আনন্দিত করার একটি মাধ্যম, কাউকে বিব্রত বা অপমান করার অস্ত্র নয়।
শিশুদের সঙ্গেও তাঁর প্রাণবন্ত আচরণ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মাঝে চরিত্রগুণে সর্বোত্তম ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল, যাকে আবু উমায়র বলে সম্বোধন করা হতো। বর্ণনাকারী বলেন, আমি অনুমান করি তিনি বলেছিলেন যে, সে দুধ ছাড়ানো বয়সের ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই (আমাদের ঘরে) আসতেন, তখন তাকে দেখে বলতেন, হে আবু উমায়রা! কি করেছো নুগায়র (চড়ুইছানা)? এ কথা বলে তিনি তার সঙ্গে খেলা করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২১৫০)
ছো্ট্ট উমায়রা নুগায়র নামের চড়ুইছানাটি নিয়ে খেলা করতো। একজন মহান নবী হয়েও তিনি শিশুর ছোট্ট মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তার পাখিটি নিয়ে তার সাথে খুনসুটি করতেন। কারণ তাঁর কাছে শিশুর জগৎও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তাঁর হাসি-রসিকতা কখনো দায়িত্ববোধকে আড়াল করেনি। তিনি ছিলেন ভারসাম্যের জীবন্ত পাঠ। তিনি ছিলেন ইবাদতে গভীর, দায়িত্বে দৃঢ়, বিপদে ধৈর্যশীল; আবার মানুষের সঙ্গে আচরণে হাসিমুখ ও প্রাণবন্ত।
আজকের জীবনে এই ভারসাম্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। গম্ভীরতা যেন আমাদের কঠিন হৃদয়ের মানুষ না বানায়, আর হাস্যরস যেন শালীনতা ও সত্যের সীমা অতিক্রম না করে। মহানবী (সা.)-এর হাসি আমাদের শেখায়, ধর্মীয় জীবন মানে বিষণ্নতা নয়; বরং ঈমানের গভীরতার সঙ্গে সৌন্দর্য, সৌজন্য ও প্রাণবন্ততাও মানুষের চরিত্রকে পূর্ণতা দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






