হিজরতের সফরে সাওর গুহার সাপের গল্পটি কি সত্য?
- সিরাত বর্ণনায় সাওর গুহায় সাপের ঘটনা কতটা সত্য?

সংগৃহীত ছবি
হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল বিপদের আশঙ্কা আর আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা। মক্কার কুরাইশরা যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করল, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে তাঁরা মক্কার দক্ষিণে অবস্থিত সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। বাইরে চলতে তখনো কুরাইশদের তাড়া আর অনুসন্ধান। ভেতরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর প্রিয় সাহাবি আবু বকর (রা.)। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শত্রুরা গুহার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।
এই মুহূর্তের কথাই পবিত্র কোরআন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে,
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ ٱللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ثَانِىَ ٱثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِى ٱلْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَـٰحِبِهِۦ لَا تَحْزَنْ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَاۖ
‘তোমরা যদি তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছেন। যখন কাফিররা তাঁকে বের করে দিয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন দুজনের একজন; যখন তারা উভয়ে গুহায় ছিল, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আত-তাওবা আয়াত : ৪০)
সাওর গুহার এই মূল ঘটনা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু জনপ্রিয় কাহিনির ঐতিহাসিক ও হাদিসগত ভিত্তি নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হলো গুহায় আবু বকর (রা.)-কে সাপের দংশনের ঘটনা।
প্রচলিত কাহিনি
বিভিন্ন ওয়াজ, বক্তৃতা ও সিরাতের আলোচনায় বলা হয়, সাওর গুহায় প্রবেশের পর আবু বকর (রা.) গুহার ভেতরে কয়েকটি গর্ত দেখতে পান। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেন কোনো বিপদের সম্মুখীন না হন, সে জন্য তিনি নিজের পা দিয়ে একটি গর্তের মুখ বন্ধ করে দেন। গর্তের ভেতরে থাকা একটি সাপ তাঁর পায়ে দংশন করে। প্রচণ্ড ব্যথা সত্ত্বেও তিনি পা সরাননি, কারণ তাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কষ্ট হতে পারে।
বর্ণনাটিতে আরও বলা হয়, বিষের যন্ত্রণায় আবু বকর (রা.)-এর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। সেই অশ্রু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীরে পড়লে তিনি জেগে ওঠেন। তখন আবু বকর (রা.) বিষয়টি জানালে নবীজি (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন আর আহত জায়গায় মুখে লালা লাগিয়ে দেন। তাতে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাথা চলে যায় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার ওপর প্রশান্তি নাজিল হয়।
কাহিনিটি নিঃসন্দেহে আবেগময়। এতে আবু বকর (রা.)-এর ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপত্তার প্রতি তার গভীর উদ্বেগের একটি চিত্র ফুটে ওঠে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে কোনো ঘটনা আবেগময় হওয়া তার সত্যতার প্রমাণ নয়। প্রশ্ন হলো, এই কাহিনির সনদ কী বলে?
হাদিসবিশারদদের বিচারে সাপের কাহিনি
সাওর গুহায় সাপের দংশনের এই বর্ণনাটি ইমাম বায়হাকির দালাইলুন নুবুওয়া গ্রন্থে পাওয়া যায় (২/৪৭৬-৪৭৭)। কিন্তু বর্ণনাটির সনদে এমন কয়েকজন রাবি রয়েছেন, যাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে হাদিসবিশারদদের কঠোর আপত্তি রয়েছে।
বর্ণনাটির সঙ্গে আবদুর রহমান ইবনু ইবরাহীম আর-রাসিবীর নাম যুক্ত। রিজালশাস্ত্রের ইমামরা তার ব্যাপারে গুরুতর সমালোচনা করেছেন। সনদে থাকা ফুরাত ইবনুস সায়িবও নির্ভরযোগ্য রাবি হিসেবে স্বীকৃত নন; বরং মুহাদ্দিসদের কাছে তিনি পরিত্যক্তদের অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম যাহাবি মীযানুল ই‘তিদাল-এ সংশ্লিষ্ট রাবিদের আলোচনা করেছেন এবং বর্ণনাটিকে মাওদূ বা জাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (২/৪৫৪; ৪/৫০৩-৫০৪)। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি লিসানুল মীযান-এও বর্ণনাটির ব্যাপারে কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং এটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন (৪/৩৯৭; ৬/৯-১০)।
অতএব, সাওর গুহায় আবু বকর (রা.)-কে সাপের দংশনের এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে সহিহ বা নির্ভরযোগ্য সিরাতের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।
তাহলে সাওর গুহায় কী ঘটেছিল?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সাপের কাহিনি অপ্রমাণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সাওর গুহার ঘটনাই দুর্বল বা কাল্পনিক। বরং এর বিপরীতটাই সত্য। গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা কোরআন দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত।
সহিহ বুখারির একটি বিখ্যাত বর্ণনায় আবু বকর (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেছিলেন, ‘তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের নিচে তাকায়, তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে।’ জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللهُ ثَالِثُهُمَا
‘হে আবু বকর! এমন দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?’ (বুখারি, হাদিস : ৩৬৫৩)
এই বর্ণনাই সাওর গুহার প্রকৃত শিক্ষা বহন করে। বিপদের মুখে রাসুলুল্লাহ (সা.) আতঙ্কিত হননি। আবু বকর (রা.)-এর উদ্বেগের মুহূর্তে তিনি তাঁকে আল্লাহর সঙ্গ ও সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
সত্য ঘটনাই কি যথেষ্ট নয়?
সিরাতের ক্ষেত্রে আমাদের একটি মানসিক প্রবণতা কাজ করে। আমরা অনেক সময় মনে করি, কোনো ঘটনা যত বেশি আবেগময়, তত বেশি মানুষকে তা শোনানো দরকার। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এমনিতেই এত বিস্ময়কর যে সেখানে আবেগ তৈরির জন্য অতিরিক্ত গল্পের প্রয়োজন নেই।
আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যও সাপের কাহিনির প্রয়োজন নেই। কোরআনই তাকে নবীজি (সা.)-এর ‘সঙ্গী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। হিজরতের সেই ভয়াবহ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তার থাকা, নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে প্রিয় নবীকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা এবং সেই সংকটময় মুহূর্তে নবীজির সঙ্গে তার অবস্থান তার মর্যাদার জন্য যথেষ্ট।
সিরাত বর্ণনায় আমানতদারি
ইসলামি জ্ঞানচর্চায় একটি মৌলিক নীতি হলো, সত্যকে সুন্দর করার জন্য মিথ্যার প্রয়োজন নেই। কোনো বর্ণনা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেলেও তার সূত্র যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে নবীজি (সা.)-এর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হলে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান করে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৭)
অতএব, কোনো বক্তা বা লেখকের দায়িত্ব শুধু হৃদয় স্পর্শ করা নয়; সত্যের প্রতি আমানতদার থাকাও তাঁর দায়িত্ব। সাপের কাহিনি হয়তো শ্রোতার চোখে পানি আনতে পারে, কিন্তু যদি তা প্রমাণিত না হয়, তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাতের সঙ্গে সেটিকে জুড়ে দেওয়া উচিত নয়।
সাওর গুহার আসল শিক্ষা
সাওর গুহার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো সাপ, মাকড়সা বা কবুতরের অলৌকিক কাহিনিতে নয়। এর শিক্ষা হলো আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা।
মানুষের চোখে যখন সব পথ বন্ধ, তখনো আল্লাহর সাহায্যের দরজা খোলা থাকে। শত্রু যখন এত কাছে যে তাদের পায়ের শব্দ শোনা যায়, তখনো একজন মুমিন বলতে পারে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’
তাই সাওর গুহার ইতিহাস বলতে গিয়ে আমাদের উচিত কোরআনের সেই বাক্যটিকেই সামনে রাখা। কারণ এটি কোনো দুর্বল বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি স্বয়ং আল্লাহর কালাম।
সাপের গল্প হয়তো আমাদের আবেগাপ্লুত করতে পারে। কিন্তু সাওর গুহার প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত রয়েছে সেই আস্থায়, যে আস্থা বিপদের গভীর অন্ধকারেও বলে ওঠে—‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’
সিরাতের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা তাই শুধু আবেগময় ঘটনা বলা নয়; বরং যা প্রমাণিত, তা প্রমাণিত হিসেবে এবং যা অপ্রমাণিত, তা অপ্রমাণিত হিসেবে তুলে ধরার মধ্যেই রয়েছে সত্যিকারের আমানতদারি।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক



