মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব গুণাবলি ও সামাজিক অবস্থান (প্রথম পর্ব)

প্রতীকী ছবি
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়্যতপ্রাপ্তি মানব ইতিহাসের এক অনন্য মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। তবে বিষয়টি মোটও এমন নয় যে, তিনি যখন চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি লাভ করেন, তখনই তাঁর চরিত্রে সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ দেখা দিয়েছে। বরং নবুয়্যতের বহু আগেই তাঁর জীবন এসব মহৎ গুণে পরিপুর্ণ ও সমৃদ্ধ ছিল। এমনকি মক্কার যে সমাজে মূর্তিপূজা, গোত্রীয় অহংকার, সুদ, মদ, জুয়া, নারী নির্যাতন, দুর্বলদের ওপর অত্যাচার এবং রক্তের প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রবল ছিল, সেই সমাজেও তিনি স্বতন্ত্র মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতার আসন অর্জন করেছিলেন।
মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন মক্কার সম্মানিত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছেন। মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাবও শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শৈশবের এই প্রতিকূলতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে ভেঙে দেয়নি; বরং জীবনের বাস্তবতা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং অসহায়ত্বকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ এই শৈশবের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তিনি কি তোমাকে ইয়াতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দুহা, আয়াত : ৬)
শৈশব থেকেই মহানবী (সা.) ছিলেন নির্মল ও সংযমী স্বভাবের। জাহেলি আরবের প্রচলিত অনেক অনৈতিকতা তাঁর চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মক্কার মানুষের প্রচলিত মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারে অংশ নিতেন না। মহান আল্লাহ তাঁকে নানান ভাবে হিফাজত করেছিলেন। তিনি নিজেই নবুয়্যতের আগের একটি ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি একবার কুরাইশ যুবকদের সঙ্গে কাবার নির্মাণকাজে অংশ নেওয়ার সময় কাপড় কাঁধে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন; তখন তিনি এমনভাবে পড়ে যান যে এরপর আর সে ধরনের কাজ করেননি। (বুখারি, হাদিস : ৩৮২৯)
তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সত্যবাদিতা। নবুয়্যতের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ ‘বিশ্বস্ত’ এবং ‘আস-সাদিক’ অর্থাৎ ‘সত্যবাদী’ বলে অভিহিত করেছিল। এটি শুধু মুসলিম সমাজের দেওয়া কোনো সম্মানসূচক উপাধি ছিল না; বরং মক্কার অবিশ্বাসী সমাজেও তাঁর সততা সর্বজনস্বীকৃত ছিল। মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমার সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি।’ (সুরা নাজম, আয়াত : ২)
তাঁর আমানতদারির খ্যাতি ছিল আরও বিস্ময়কর। যে সমাজে তিনি পরবর্তীতে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হন, সেই সমাজের লোকেরাই নিজেদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছে আমানত রাখত। এমনকি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময়ও বহু মুশরিকের আমানত তাঁর কাছে ছিল। হিজরতের আগে তিনি মানুষের আমানতগুলো তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে আলী (রা.)-কে নির্দেশ দেন। একজন মানুষের সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতার এর চেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ আর কী হতে পারে!
ব্যবসায়িক জীবনেও তাঁর সততা ও ন্যায়পরায়ণতা ছিল অভুতপূর্ব। তরুণ বয়সে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং সিরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক সফর করেন। খাদিজা (রা.) তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততার কথা জেনে তাঁকে নিজের বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে শাম অঞ্চলে যাওয়ার দায়িত্ব দেন। তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রতারণা, মিথ্যা বা অসততার কোনো নজির পাওয়া যায় না। বরং তাঁর বিশ্বস্ততা ও উত্তম চরিত্র খাদিজা (রা.)-কে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁদের বিবাহ হয়। (ইবন হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ)
নবুয়্যতের আগেই তিনি ছিলেন ন্যায়বোধসম্পন্ন একজন মানুষ। মক্কার সামাজিক বাস্তবতায় এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ‘হিলফুল ফুদুল’। মক্কার কয়েকটি গোত্র মিলে একটি চুক্তি করেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় কোনো বহিরাগত বা দুর্বল ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। নবুয়্যতের পরও মহানবী (সা.) এই চুক্তির প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবন জুদআনের ঘরে এমন একটি চুক্তিতে তিনি উপস্থিত ছিলেন, যার বিনিময়ে লাল উট পেলেও তিনি তা ভঙ্গ করতে চাইতেন না; ইসলামের যুগেও তাঁকে এমন চুক্তির জন্য আহ্বান করা হলে তিনি তাতে সাড়া দিতেন। (ইবন হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ)
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর সামাজিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। তিনি কেবল ব্যক্তিগতভাবে সৎ ছিলেন না; বরং মক্কার বিভিন্ন গোত্রের মানুষেরও তাঁর বিচারবুদ্ধি ও নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা ছিল। কোনো গোত্রই তাঁকে নিজেদের পক্ষের লোক হিসেবে না দেখে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম একজন বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে দেখতো।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক








