সিরাত
মহানবী (সা.)-এর অনুপম চরিত্র-মাধুর্য
- যে চরিত্রে মুগ্ধ হয়েছিল পৃথিবী
- উত্তম চরিত্রের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মহানবী (সা.)
- মহানবী (সা.)-এর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য

ফাইল ছবি
মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার চেহারা, পোশাক কিংবা সম্পদে নয়। ব্যক্তির চরিত্রের মাধ্যমেই তার আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। কারণ একজন মানুষের কথা, আচরণ, ক্ষমাশীলতা, নম্রতা ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের মধ্যেই তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। আর চরিত্রের পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। পবিত্র কোরআন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম, আয়াত : ৪)
আয়েশা (রা.)-এর কাছে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি তাঁর জীবনের কয়েকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছিলেন। আবু আবদুল্লাহ আল-জাদালি (রহ.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন—
مَا كَانَ فَاحِشًا، وَلَا مُتَفَحِّشًا، وَلَا صَخَّابًا فِي الْأَسْوَاقِ، وَلَا يَجْزِي بِالسَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ، وَلَكِنْ يَعْفُو وَيَصْفَحُ
‘তিনি অশ্লীলভাষী ছিলেন না, অশ্লীল আচরণও করতেন না, বাজারে হৈচৈ করতেন না এবং মন্দের প্রতিশোধ মন্দ দিয়ে নিতেন না; বরং তিনি ক্ষমা করে দিতেন এবং উপেক্ষা করতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২০১৬)
এই বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের এক বিস্ময়কর পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠেছে।
হাদিসের প্রথম বৈশিষ্ট্য, “مَا كَانَ فَاحِشًا”। অর্থাৎ তিনি অশ্লীল ছিলেন না। অশ্লীল কথা, কুরুচিপূর্ণ ভাষা কিংবা শালীনতাবিবর্জিত আচরণ তাঁর স্বভাবের অংশ ছিল না। শুধু তা-ই নয়, “وَلَا مُتَفَحِّشًا” বলে আয়েশা (রা.) আরও স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি নিজে অশ্লীলতা করতেন না এবং অশ্লীল আচরণকে নিজের স্বভাবেও পরিণত করেননি।
মুমিন বান্দার পরিচয় দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلاَ اللَّعَّانِ وَلاَ الْفَاحِشِ وَلاَ الْبَذِيءِ
‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
আজকের সামাজিক বাস্তবতায় এ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতের অমিল, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে মানুষ খুব সহজেই কটু কথা ও অপমানজনক ভাষায় জড়িয়ে পড়ে। নবীজির (সা.) চরিত্র আমাদের শেখায়, সত্য কথা বললেও তা বলতে হবে শালীনতা ও সৌজন্যের সঙ্গে।
হাদিসে এসেছে, “وَلَا صَخَّابًا فِي الْأَسْوَاقِ”। অর্থাৎ তিনি বাজারে চিৎকার-চেঁচামেচি বা হৈচৈ করতেন না। এখানে শুধু বাজারে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার বিষয়টি নয়, বরং জনসমক্ষে অশোভন উত্তেজনা, কোলাহল ও অসংযত আচরণ থেকেও বিরত থাকার একটি নীতিগত শিক্ষা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বিনয়ী আচরণ করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু রূঢ়তা ছিল না; কর্তৃত্ব ছিল, কিন্তু অহংকার ছিল না। পবিত্র কোরআন তাঁর এই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে ঘোষনা করেছে, ‘আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
হাদিসের সবচেয়ে গভীর শিক্ষাগুলোর একটি হলো, “وَلَا يَجْزِي بِالسَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ”। অর্থাৎ তিনি মন্দের প্রতিশোধ মন্দ দিয়ে নিতেন না।
এর অর্থ এই নয় যে তিনি অন্যায়কে সমর্থন করতেন কিংবা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতেন না। বরং ব্যক্তিগতভাবে কেউ তাঁকে কষ্ট দিলে প্রতিশোধপরায়ণতার বদলে তিনি ক্ষমা ও সংশোধনের পথ বেছে নিতেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ; কিন্তু যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪০)
নবী জীবনে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। মক্কাবাসী তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের বছরের পর বছর নির্যাতন করেছে, দেশত্যাগে বাধ্য করেছে, যুদ্ধ করেছে। কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ব্যাপক ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এটি ছিল তাঁর চরিত্রের শক্তি, দুর্বলতা নয়।
আয়েশা (রা.) বলেছেন, “وَلَكِنْ يَعْفُو وَيَصْفَحُ”। তিনি ক্ষমা করতেন এবং উপেক্ষা করতেন। এখানে দুটি শব্দের ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আফও’ (العفو) অর্থ অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া, আর ‘সাফহ’ (الصفح)-এর মধ্যে রয়েছে বিষয়টি উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু মুখে ক্ষমার কথা বলেননি; তিনি নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করেছেন। কোরআন তাঁকে নির্দেশ দিয়েছে, ‘তুমি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৯৯)
তবে ক্ষমাশীলতার অর্থ অন্যায়ের প্রতি উদাসীনতা নয়। যেখানে ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেখানে ক্ষমা করা মহত্ত্ব; আর যেখানে মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, সেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। নবীজির (সা.) চরিত্রে ক্ষমা ও ন্যায়বিচার উভয়েরই সুন্দর সমন্বয় ছিল।
নবীজির চরিত্র ছিল কোরআনের বাস্তব রূপ
আয়েশা (রা.)-কে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছিলেন, “كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ” অর্থাৎ, ‘তাঁর চরিত্রই ছিল কোরআন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৪৬)
এই বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। পবিত্র কোরআন মানুষকে সত্যবাদিতা, দয়া, ক্ষমা, বিনয়, ধৈর্য, ন্যায়বিচার ও উত্তম ব্যবহারের যে শিক্ষা দিয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনে তার বাস্তব নমুনা হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাঁর চরিত্র অধ্যয়ন মানে কোরআনের নৈতিক শিক্ষাগুলো কীভাবে একজন মানুষের জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে তা দেখা।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ ঘোষণা করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ২১)
আমাদের জীবনে নববী চরিত্রের প্রয়োগ
নবীজির (সা.) চরিত্র-মাধুর্য মুসলিম জীবনের অনুসরণীয় আদর্শ। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজসহ সকল ক্ষেত্রেই তাঁর চরিত্রের শিক্ষা প্রয়োগ করা সম্ভব। কটু কথার জবাবে কটু কথা না বলা, রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা, মানুষের ভুল ক্ষমা করা, দুর্ব্যবহারের প্রতিশোধ না নেওয়া এবং সর্বাবস্থায় শালীনতা বজায় রাখা তাঁর সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে তারা, যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৮)
কাজেই মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম প্রমাণ হলো তাঁর চরিত্রকে নিজের জীবনে ধারণ করা। মুখে তাঁর প্রশংসা করা সহজ, কিন্তু তাঁর মতো ক্ষমাশীল হওয়া, তাঁর মতো সংযত ভাষায় কথা বলা এবং তাঁর মতো মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা হলো সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ। মহানবী (সা.)-এর চরিত্র মাধুর্য যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সর্বত্র সৌন্দর্য আর শান্তি বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






