রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় মুসলিম নাগরিকের দায়িত্ব

প্রতীকী ছবি
রাষ্ট্রের স্থিতি শুধু আইন, প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে নাগরিকের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আইন মানার সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্রের সংবিধান যতই সুসংগঠিত হোক, আইন প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলো যতই শক্তিশালী হোক, নাগরিকেরা যদি দায়িত্ব পালনে উদাসীন হয়ে পড়েন, তাহলে কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘদিন শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র মূলত শাসক ও জনগণের পারস্পরিক দায়িত্ব, অধিকার ও আস্থার একটি নৈতিক কাঠামো।
ইসলাম এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। ইসলামে একজন মুসলিমের দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল সদস্য। তার কথা, আচরণ ও কর্ম যেন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি না করে এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টের কারণ না হয়, সে বিষয়ে ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল, তাদেরও।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৯) এই আয়াত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি একজন মুসলিমের দায়িত্বের মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরে। এখানে ‘কর্তৃত্বশীল’ বলতে শাসক ও বৈধ কর্তৃপক্ষকে বোঝানো হয়েছে। তবে ইসলামে আনুগত্য অন্ধ বা সীমাহীন নয়। আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যতার কোনো নির্দেশ এলে সেখানে আনুগত্যের প্রশ্ন নেই। এ সীমারেখা রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ দেওয়া না হয়, ততক্ষণ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাসকের আনুগত্য করা কর্তব্য।’ (বুখারি, হাদিস: ৭১৪৪)
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনানুগ কর্তৃপক্ষের প্রতি সহযোগিতা ও আনুগত্য ইসলামী নাগরিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তবে একই সঙ্গে ইসলাম অন্যায়কে সমর্থন করার অনুমতিও দেয় না। ফলে একজন মুসলিম নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যে যেমন আইন ও শৃঙ্খলা মেনে চলা রয়েছে, তেমনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়াও রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রথম শর্ত হলো অন্যের নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ৪০)
এই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক তাৎপর্যও ব্যাপক। একজন নাগরিকের অসতর্ক আচরণ যখন অন্যের জীবন, সম্পদ বা নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, তখন তা আর শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, সরকারি সম্পদ বিনষ্ট করা, জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়া রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইসলাম মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে ‘আমানত’ হিসেবে বিবেচনা করে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)
নাগরিকের দায়িত্বও এক ধরনের আমানত। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীলভাবে সরকারি সেবা গ্রহণ ও প্রদান, কর ও বৈধ আর্থিক দায় পরিশোধ, জনসম্পদ অপচয় না করা এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এই আমানতেরই অংশ। তাই সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ বা নষ্ট করা, ঘুষের মাধ্যমে কাজ আদায় করা কিংবা কর ফাঁকি দেওয়াকে শুধু প্রশাসনিক অপরাধ হিসেবে দেখলে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এগুলোর সঙ্গে নৈতিকতা ও আমানতদারিতার প্রশ্নও জড়িত।
রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টের আরেকটি বড় কারণ হলো ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৬)
এই নির্দেশের আলোকে সমাজে অকারণ উত্তেজনা সৃষ্টি, গুজব ছড়ানো, মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ উসকে দেওয়া, জননিরাপত্তা বিপন্ন করা কিংবা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মতের পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও থাকবে; কিন্তু মতপার্থক্যকে নৈরাজ্য বা সহিংসতায় পরিণত করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনার জীবনেও আমরা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। মদিনায় তিনি মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের নীতিমালা নির্ধারণ করেছিলেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ বা ‘মিসাকুল মদিনা’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামী সমাজব্যবস্থায় নাগরিকের নিরাপত্তা, পারস্পরিক দায়িত্ব এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার অর্থ অন্যায় দেখেও নীরব থাকা নয়। ইসলাম ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কথা বলার সাহসও শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে ন্যায় কথা বলা।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৩৪৪)
এখানে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানটি স্পষ্ট। একদিকে রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, অন্যদিকে অন্যায় ও জুলুমের সামনে সত্য উচ্চারণের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবাদ হতে হবে ন্যায়, প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে; এমনভাবে নয়, যাতে অন্যায় প্রতিরোধের নামে আরও বড় অন্যায় বা সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
আজকের সমাজে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, তখন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। আইন ভঙ্গের সুযোগ খোঁজা, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, ব্যক্তিস্বার্থে জনস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া কিংবা অন্যের অধিকারকে তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা রাষ্ট্রের কাঠামোকেই দুর্বল করে। শুধু সরকারের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো, পরিবর্তনের সূচনা মানুষের নিজের ভেতর থেকেই করতে হবে। একজন মুসলিম নামাজ পড়বেন, রোজা রাখবেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, আবার একই সঙ্গে তার প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, জনসম্পদ রক্ষা করবেন, আইন মেনে চলবেন, অন্যায় ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকবেন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন। ব্যক্তির নৈতিকতা থেকেই সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি তৈরি হয়।
একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় রাষ্ট্র কেবল শক্তিশালী আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে ন্যায়পরায়ণ শাসন এবং দায়িত্বশীল নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তাই রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ দায়িত্বের দিকে তাকানো প্রয়োজন। ইসলামের শিক্ষা সেই আত্মজিজ্ঞাসার পথই দেখায়।
মহান আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের এবং ন্যায়, শান্তি ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক







