কোরআনের বাণী
ঈমানের দাবি ও বাস্তব জীবনের বৈপরীত্য

কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ২৫
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ مَّنۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ لَیَقُوۡلُنَّ اللّٰهُ ؕ قُلِ الۡحَمۡدُ لِلّٰهِ ؕ بَلۡ اَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۵﴾
২৫. আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সকল প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতে পবিত্র কুরআনের দাওয়াতি ভাষার এক গভীর সৌন্দর্য ও যুক্তির শক্তি নিহিত আছে। মক্কার মুশরিকরা যদিও মূর্তি পূজা করত, তবুও তারা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করত না। বরং তারা বিশ্বাস করত, এই বিশাল আসমান, পৃথিবী, চন্দ্র-সূর্য, পাহাড়-নদী ও সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহই। পবিত্র কুরআন তাদের সেই স্বীকৃতিকেই দলিল হিসেবে সামনে এনেছে।
অর্থাৎ, যখন তারা নিজেরাই স্বীকার করছে যে সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ, তখন প্রশ্ন হলো, ইবাদত ও উপাসনা অন্যের জন্য কেন? সাহায্য প্রার্থনা, মানত, ভক্তি, ভয় ও নির্ভরতা কেন মূর্তি বা অন্য সত্তার প্রতি নিবেদিত হবে? এই আয়াত মূলত তাওহীদের যুক্তিগত ভিত্তিকে স্পষ্ট করেছে। সৃষ্টি যদি আল্লাহর হয়, তবে উপাসনাও একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।
তাফসিরকারগণ বলেন, এখানে “قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ” বা ‘বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই’ কথাটির ভেতরে কয়েকটি তাৎপর্য রয়েছে।
প্রথমত, সত্যকে তাদের মুখ দিয়েই স্বীকার করিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর প্রশংসা।
দ্বিতীয়ত, এই স্বীকৃতি মানুষের ফিতরাত বা সহজাত প্রবৃত্তির সাক্ষ্য বহন করে। মানুষ বিপদে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই একক স্রষ্টার দিকেই ফিরে যায়।
তৃতীয়ত, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সান্ত্বনা যে, বিরোধিতা সত্ত্বেও সত্য মানুষের অন্তরে লুকিয়ে আছে।
আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা এরপর বলেন, ‘কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না’। অর্থাৎ তারা প্রকৃত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। তারা স্রষ্টাকে চিনলেও তাঁর অধিকারকে চিনতে পারেনি। তারা বুঝতে পারেনি, রব হিসেবে যিনি একক, ইলাহ হিসেবেও তিনিই একক।
ইবনে কাসির রহ. বলেন, তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানলেও ইবাদতে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এটাই ছিল তাদের অজ্ঞতা।
এই আয়াত আজকের মানুষের জন্যও গভীর শিক্ষার উৎস। বর্তমান যুগে অনেক মানুষ আল্লাহর অস্তিত্ব মানে, কিন্তু জীবনের বিধান, ভয়, ভালোবাসা, অনুসরণ ও নির্ভরতার ক্ষেত্রে আল্লাহর পরিবর্তে প্রবৃত্তি, সমাজ, ক্ষমতা বা বস্তুবাদকে প্রাধান্য দেয়। পবিত্র কুরআন মনে করিয়ে দেয়, কেবল স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার একত্বকে মেনে নেওয়াই প্রকৃত ঈমান।
ইমাম তাবারি রহ. উল্লেখ করেন, এই আয়াতে মুশরিকদের আত্মবিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে। কারণ তারা মুখে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান স্রষ্টা বলত, কিন্তু কাজে তাঁর সঙ্গে শরিক স্থির করত। তাই পবিত্র কুরআন তাদের চিন্তার অসঙ্গতিকে উন্মোচন করেছে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায়।
আয়াতটি আমাদের আরও শেখায়, মানুষের অন্তরে সত্যের বীজ থাকে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সেই স্বীকৃত সত্যকে কেন্দ্র করেই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা উচিত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মানুষের স্বীকৃত বাস্তবতা থেকে তাওহীদের পূর্ণতার দিকে আহ্বান করেছেন।
এই সংক্ষিপ্ত আয়াত তাই শুধু একটি প্রশ্ন-উত্তর নয়; বরং এটি মানবচেতনার গভীরে রাখা তাওহীদের স্বাভাবিক সাক্ষ্য, যুক্তির নির্মোহ ভাষা এবং শিরকের অসারতার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন কুরআনিক ঘোষণা।


