সম্পদ হোক আখিরাতের পাথেয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে অনেক পরিকল্পনা থাকে। কেউ সম্পদ বাড়াতে চান, কেউ ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে চান, আবার কেউ জীবনের ব্যস্ততায় ভালো কাজের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা পিছিয়ে দেন। মনে করেন, সময় হলে দান করবেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আরও বেশি কাজ করবেন। কিন্তু মৃত্যু কারও জন্য অপেক্ষা করে না। যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এ বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সময় থাকতে সৎকাজে এগিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
وَ اَنۡفِقُوۡا مِنۡ مَّا رَزَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ اَحَدَكُمُ الۡمَوۡتُ فَیَقُوۡلَ رَبِّ لَوۡ لَاۤ اَخَّرۡتَنِیۡۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَ اَكُنۡ مِّنَ الصّٰلِحِیۡنَ
‘আর আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। অন্যথায় সে বলবে, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে আরও কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত : ১০)
পরের আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কারও নির্ধারিত সময় এসে গেলে আল্লাহ তাকে কখনো অবকাশ দেবেন না।
আয়াতটি আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সম্পদ, সামর্থ্য ও সুযোগ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। এগুলোর প্রকৃত কল্যাণ তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সেগুলো ব্যয় করে। এখানে ব্যয় করার নির্দেশের মধ্যে জাকাত, সদকা, অভাবী মানুষের সাহায্য এবং কল্যাণকর কাজে সম্পদ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
মানুষ সাধারণত ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে আগ্রহী। পরিবারের প্রয়োজন, সন্তানের শিক্ষা ও নিজের বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্য পরিকল্পনা করা দোষের নয়। কিন্তু দুনিয়ার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে আখিরাতের প্রস্তুতি অবহেলা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সম্পদ জমাতে জমাতে যদি মানুষের মৃত্যু এসে যায়, অথচ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো না হয়, তাহলে সেই অবহেলার জন্য তাকে অনুতপ্ত হতে হবে। মৃত্যুর পর অনুশোচনা থাকলেও দুনিয়ায় ফিরে এসে নেক আমল করার সুযোগ আর থাকবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
يَتْبَعُ الْمَيِّتَ ثَلاَثَةٌ فَيَرْجِعُ اثْنَانِ وَيَبْقَى مَعَهُ وَاحِدٌ يَتْبَعُهُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَعَمَلُهُ فَيَرْجِعُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَيَبْقَى عَمَلُهُ
‘তিনটি বিষয় মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে: তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। অতঃপর দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, আর তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫১৪)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার সম্পদ ও সম্পর্ক একসময় পেছনে পড়ে থাকবে। মানুষের সঙ্গে থাকবে তার কর্মের ফল। তাই জীবিত অবস্থায় সম্পদকে সৎকাজের মাধ্যম বানানো জরুরি। সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্রকে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা, এতিমের দায়িত্ব নেওয়া এবং মানুষের উপকারে আসে এমন কাজে ব্যয় করা মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য শুধু বড় অঙ্কের দানই প্রয়োজন নয়। আন্তরিকতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট ভালো কাজও মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
‘জাহান্নাম থেকে বাঁচো, যদিও অর্ধেক খেজুর দান করার মাধ্যমে হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪১৭)
অতএব, নেক আমলের জন্য বার্ধক্য কিংবা অবসর জীবনের অপেক্ষা করা উচিত নয়। আজ যে সুযোগ আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। জীবন ও সম্পদ আল্লাহর আমানত। মৃত্যুর আগে সেই আমানতকে সৎকাজে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ যে অবকাশ চাইবে, আজকের সময়ই তার জন্য সেই সুযোগ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



