প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর অনুপম ভালোবাসা

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন বান্দার ব্যথার জবাবে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কথা বলেছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আদ-দোহা নাজিল হওয়া তেমনই এক ঘটনা। এটি প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্য তাঁর রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক অনুপম ভালোবাসার চিঠি, এক আসমানি সান্ত্বনাবার্তা, এক হৃদয়ছোঁয়া আশ্বাস।
নবুয়তের সূচনালগ্ন। হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাজিল হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মানবজাতি পেয়েছে শেষ নবীকে। জিবরাঈল (আ.) নিয়মিত আল্লাহর বাণী নিয়ে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু যেন থেমে গেল। ওহীর ধারা বন্ধ হয়ে গেল। জিবরাঈল (আ.) আর আসছেন না।
দিন যায়, রাত যায়। অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।
যে হৃদয় ওহীর আলোয় আলোকিত হয়েছিল, সেই হৃদয় আবার আসমানের বার্তার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কখন আবার জিবরাঈল (আ.) আসবেন, কখন আবার আল্লাহর বাণী নিয়ে উপস্থিত হবেন, সেই প্রতীক্ষায় তাঁর দিন কাটতে থাকে।
ইমাম বুখারি (রহ.) তার সহিহ গ্রন্থে ‘ফাতরাতুল ওহী’ বা ওহীর সাময়িক বিরতির এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। (বুখারি, হাদিস ৬৯৮২-৬৯৮৩)
কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল ওহীর বিলম্ব নয়; বরং এই সুযোগে শত্রুদের বিদ্রূপ।
মক্কার মুশরিকরা আনন্দিত হয়ে উঠল। তারা মনে করল, মুহাম্মাদ (সা.)-এর মিশন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। তাদের কটূক্তি ক্রমেই বাড়তে লাগল। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী এক নারী, যাকে অধিকাংশ মুফাসসির উম্মে জামিল বলে উল্লেখ করেছেন, ব্যঙ্গ করে বলেছিল, ‘আমি তো দেখছি তোমার সঙ্গী তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ (বুখারি, হাদিস ৪৯৫০)
কতটা কষ্টদায়ক ছিল এই কথা!
যে মানুষটি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, যিনি প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজে বেড়ান, তাঁর সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, তাঁর রব তাঁকে ছেড়ে দিয়েছেন!
বাহ্যিকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিশ্চুপ ছিলেন। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের ব্যথা তো আল্লাহ দেখছিলেন। কারণ মানুষের কাছে যা অদৃশ্য, রবের কাছে তা কখনো অদৃশ্য নয়।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো।
একদিন আবার জিবরাঈল (আ.) এলেন। আবার আসমানের দরজা খুলে গেল। আবার নাজিল হলো আল্লাহর বাণী।
কিন্তু এবার শুধু কোনো বিধান নয়, কোনো সতর্কবাণী নয়, কোনো হুকুম নয়। এবার নেমে এলো ভালোবাসা, সান্ত্বনা এবং আশ্বাসে ভরা এক বার্তা।
যেখানে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে বললেন, ‘তুমি কেন এত চিন্তিত? তুমি কেন ভাবছ আমি তোমাকে ভুলে গেছি? তুমি কেন মনে করছ আমি তোমার ওপর অসন্তুষ্ট?’
এরপর ধ্বনিত হলো সেই চিরস্মরণীয় ঘোষণা,
مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ
‘আপনার প্রতিপালক আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।’ (সূরা আদ-দোহা, আয়াত : ৩)
কোরআনের অসংখ্য আয়াতের মধ্যে এই আয়াতের আবেগ একেবারেই আলাদা। এখানে কোনো তিরস্কার নেই, কোনো সতর্কতা নেই। আছে কেবল ভালোবাসা।
আল্লাহ চাইলে বলতে পারতেন, ‘আমি তোমাকে ত্যাগ করিনি।’ কিন্তু তিনি বললেন, ‘তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেননি।’
‘রব’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্নেহ, লালন-পালন, মমতা ও নিরাপত্তার অনুভূতি। যেন একজন মায়ের কোলের শিশুকে বলা হচ্ছে, ‘আমি তো আছি, ভয় কিসের?’
এরপর আল্লাহ শুধু বর্তমানের সান্ত্বনাই দেননি; ভবিষ্যতের সুসংবাদও দিয়েছেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, সামনের দিনগুলো আরও সুন্দর হবে, আরও উজ্জ্বল হবে। আজ যে কষ্ট, আগামীকাল তা আনন্দে রূপ নেবে। আজ যে অশ্রু, আগামীকাল তা বিজয়ের হাসিতে পরিণত হবে।
সেদিন হয়তো রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতেন না যে, একদিন মক্কা তাঁর সামনে মাথা নত করবে। জানতেন না যে, আরব উপদ্বীপ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেবে। জানতেন না যে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁর নাম শুনে দরুদ পাঠ করবে। কিন্তু তাঁর রব সব জানতেন।
আর তাই তিনি তাঁর প্রিয় হাবীবকে আশ্বস্ত করলেন।
এরপর আল্লাহ তাঁর অতীত জীবনের স্মৃতিগুলো সামনে নিয়ে এলেন।
তিনি যেন বললেন, ‘তুমি কি এতিম ছিলে না? আমি কি তোমাকে আশ্রয় দিইনি? তুমি কি অভাবগ্রস্ত ছিলে না? আমি কি তোমাকে অভাবমুক্ত করিনি? তুমি কি পথের সন্ধান করছিলে না? আমি কি তোমাকে পথ দেখাইনি?”
এ যেন স্মৃতির আয়নায় ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।
একজন মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে, তখন তাকে শক্তি দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অতীতের অনুগ্রহগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আল্লাহও তাই করলেন। তিনি তাঁর প্রিয় নবীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘আমি তো তোমার সঙ্গে সবসময় ছিলাম। জন্মের আগেই পিতাকে হারিয়েছ, আমি তোমাকে রক্ষা করেছি। ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছ, আমি তোমার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। জীবনের প্রতিটি ধাপে আমি তোমাকে আগলে রেখেছি। তাহলে আজ কেন ভাবছ আমি তোমাকে ছেড়ে দেব?’
এখানেই সুরা আদ-দোহার সবচেয়ে গভীর আবেগ লুকিয়ে আছে।
এটি শুধু একটি সূরার নাজিল হওয়ার ঘটনা নয়; এটি একজন প্রেমময় রব ও তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দার মধ্যকার সম্পর্কের এক অসাধারণ দলিল।
ইমাম ইবন কাসির (রহ.) লিখেছেন, এই সুরা নাজিল হয়েছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুঃখ দূর করার জন্য এবং তাঁকে আনন্দ ও সুসংবাদ দেওয়ার জন্য। (তাফসির ইবন কাসির)
আজও যখন কোনো মুমিন দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যে থাকে, যখন দোয়া করেও উত্তর পায় না, যখন মনে হয় আকাশ নীরব হয়ে গেছে, তখন সুরা আদ-দোহা নাজিল হওয়ার এই ঘটনা তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।
কারণ এই সূরা আমাদের শেখায়, আল্লাহর নীরবতা কখনো তাঁর পরিত্যাগ নয়। কখনো কখনো তিনি অপেক্ষা করান, কিন্তু ছেড়ে দেন না। কখনো কখনো তিনি পরীক্ষা করেন, কিন্তু ভুলে যান না। কখনো কখনো তিনি দেরি করেন, কিন্তু বঞ্চিত করেন না।
ওহীর বিরতির সেই দিনগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল। মুশরিকদের বিদ্রূপ থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সুরা আদ-দোহার সেই ভালোবাসাময় বার্তা আজও অম্লান।
আজও যেন আসমানের দিক থেকে একটি স্নেহভরা আহ্বান ভেসে আসে, যা প্রথমে শোনানো হয়েছিল প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে, কিন্তু যার সান্ত্বনা পৌঁছে যায় প্রতিটি আহত হৃদয়ে:
‘তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও নন।’
এই কারণেই সুরা আদ-দোহা শুধু একটি সুরা নয়; এটি প্রিয় নবীর জন্য তাঁর রবের ভালোবাসার চিঠি, যা চৌদ্দশ বছর পরও মানবতার হৃদয়ে আশা, প্রশান্তি ও ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




