অলিভ অয়েল নিয়ে নবীজির ঘোষণা ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার

সংগৃহীত ছবি
খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; বরং সুস্থ জীবন গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ইসলামে তাই হালাল ও পবিত্র খাদ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যেসব খাদ্যকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে মূল্যায়ন করছে, নবীজি (সা.) বহু আগেই সেগুলোর উপকারিতার দিকে মানবজাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তেমনই এক বিস্ময়কর খাদ্য হলো অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল।
পবিত্র কোরআনে জলপাইকে ‘মুবারক’ বা বরকতময় গাছ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন—
يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ
‘এটি প্রজ্বলিত হয় এক বরকতময় জলপাই গাছ থেকে।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ৩৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু জলপাইয়ের প্রশংসাই করেননি; বরং তা খাওয়া ও ব্যবহার করার নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন— ‘তোমরা জলপাই তেল খাও এবং তা শরীরে ব্যবহার করো। কারণ এটি একটি বরকতময় গাছ থেকে উৎপন্ন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৫২)
এই হাদিস আজকের পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনায় নতুনভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আধুনিক গবেষণা বলছে, অলিভ অয়েল মানবদেহের জন্য অন্যতম উপকারী প্রাকৃতিক তেল।
হৃদরোগ প্রতিরোধে অলিভ অয়েল
বর্তমান বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বহু গবেষণায় দেখেছেন, যেসব অঞ্চলে অলিভ অয়েল বেশি ব্যবহৃত হয়, সেখানে হৃদরোগ তুলনামূলক কম। বিশেষত ভূমধ্যসাগরীয় (Mediterranean) খাদ্যাভ্যাসে অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল একটি প্রধান উপাদান।
অলিভ অয়েলে রয়েছে Monounsaturated Fatty Acid, বিশেষ করে Oleic Acid, যা ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল কমাতে এবং উপকারী HDL কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে।
হার্ভার্ড
টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষণায় বলা হয়েছে,
নিয়মিত পরিমিত অলিভ অয়েল গ্রহণ হৃদরোগ
ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
(সূত্র: Harvard
T.H. Chan School of Public Health)
এক্ষেত্রে ব্যবহার রীতি: রান্নায় পরিমিত ব্যবহার করা যায় আবার সালাদে কাঁচা অলিভ অয়েল ব্যবহারও বেশ উপকারী। সকালে খালি পেটে ১ চা-চামচ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল অনেকে গ্রহণ করেন।
প্রদাহ ও শরীরের ক্ষয়রোধে কার্যকর
মানবদেহের বহু দীর্ঘমেয়াদি রোগের পেছনে ‘ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ দায়ী। অলিভ অয়েলে থাকা Oleocanthal নামক উপাদান প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীরা একে কিছুটা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক উপাদানের সঙ্গে তুলনা করেন।
ন্যাশনাল
লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে,
অলিভ অয়েলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
উপাদান শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
(সূত্র: National
Library of Medicine, PubMed)
মস্তিষ্কের সুস্থতায় অলিভ অয়েল
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও মানসিক দুর্বলতা বাড়ে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অলিভ অয়েলের স্বাস্থ্যকর চর্বি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২২ সালে Frontiers in Nutrition জার্নালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়, ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসে অলিভ অয়েল স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
এক্ষেত্রে ব্যবহার রীতি: প্রতিদিনের খাবারে পরিমিত অন্তর্ভুক্তি। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া তেলের পরিবর্তে অলিভ অয়েল ব্যবহার।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
অলিভ অয়েল ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হিসেবে অলিভ অয়েলকে গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ এটি খাবারের গ্লাইসেমিক প্রভাব কমাতে সহায়ক। আবার অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
ত্বক ও চুলের যত্নে অলিভ অয়েল
নবীজি (সা.) শুধু খেতে নয়, শরীরে ব্যবহার করতেও উৎসাহ দিয়েছেন। আধুনিক কসমেটিক বিজ্ঞানও অলিভ অয়েলকে ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী মনে করে। কারণ এতে রয়েছে ভিটামিন ই, স্কোয়ালিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বকের শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে।
এক্ষেত্রে ব্যবহার রীতি: রাতে সামান্য অলিভ অয়েল ত্বকে ব্যবহার করা যায়। চুলে ম্যাসাজ করলে শুষ্কতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। ঠোঁট ও হাতের শুষ্কতায় ব্যবহার করা যায়।
হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা
অলিভ অয়েল হজমপ্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে উপকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পরিমিত স্বাস্থ্যকর তেল অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ক্যানসার প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভূমিকা
গবেষকরা অলিভ অয়েলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল উপাদান নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। কিছু গবেষণায় এটি কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
কোন অলিভ অয়েল সবচেয়ে ভালো
সব অলিভ অয়েল সমান নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে— Extra Virgin Olive Oil (EVOO) এটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উপকারী ধরন। এতে পুষ্টিগুণ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে।
ব্যবহার করার সময় সতর্কতা: অতিরিক্ত গরমে বারবার ব্যবহার না করাই ভালো। ভেজালমুক্ত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বেছে নেওয়া জরুরি। অতিরিক্ত সেবনও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
নববী নির্দেশনা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মিল
১৪০০ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে মহানবী (সা.) যে খাদ্যের কথা বলেছেন, আজ বিজ্ঞান তার উপকারিতা নতুন ভাষায় তুলে ধরছে। এটি ইসলামের একটি সৌন্দর্যও প্রকাশ করে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা কেবল আধ্যাত্মিক নয়; বরং মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন নিয়েও গভীরভাবে সচেতন।
তবে মনে রাখতে হবে, অলিভ অয়েল কোনো জাদুকরি ওষুধ নয়। সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে পরিমিত ও সঠিক ব্যবহারে এটি উপকারী হতে পারে। ইসলামের শিক্ষা হলো ভারসাম্য, পরিমিতি ও পরিচ্ছন্ন জীবন। অলিভ অয়েলের আলোচনা সেই জীবনদর্শনেরই একটি সুন্দর উদাহরণ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






