যে অভ্যাসগুলো আপনাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবে

প্রতীকী ছবি
মানুষ জন্মগতভাবে নিষ্পাপ হলেও সময়ের পরিক্রমায় সে আর ভুল ও গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারে না। দুর্বলতা, প্রবৃত্তির টান, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে অনেক সময় জেনে বা না জেনে মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তবে ইসলাম মানুষকে নিরাশ করেনি। বরং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বাস্তব উপায় এবং ভুল হলে ফিরে আসার পথও দেখিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদমসন্তান সবাই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯; ইবন মাজাহ, হাদিস: ৪২৫১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, গুনাহহীন হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; তবে গুনাহকে অভ্যাসে পরিণত না করে তা থেকে ফিরে আসাই মুমিনের পরিচয়।
তাকওয়া অর্জন
গুনাহ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হলো আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অবলম্বন। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাকে সব সময় দেখছেন, তখন গোপনেও সে অন্যায় থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত : ২)
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের যত্ন
সালাত শুধু একটি ইবাদত নয়, এটি চরিত্র গঠনেরও মাধ্যম। নিয়মিত ও মনোযোগের সঙ্গে সালাত আদায় মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
তাই সালাতকে দায়িত্ব নয়, আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ভালো পরিবেশ ও সৎ সঙ্গ
মানুষ তার বন্ধু ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই ইসলাম সৎ মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা দেখে নেওয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩; তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৮)
সৎ সঙ্গ গুনাহ থেকে দূরে রাখে, আর অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে অন্যায়ের প্রতি অভ্যস্ত করে তোলে।
দৃষ্টি ও জিহ্বার হেফাজত
অনেক গুনাহের সূচনা হয় চোখ ও জিহ্বার মাধ্যমে। অশোভন দৃশ্য দেখা, গিবত, অপবাদ, মিথ্যা ও কটূক্তি মানুষকে পাপের দিকে ঠেলে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নূর, আয়াত : ৩০)
এর পরের আয়াতে মুমিন নারীদের জন্যও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা নূর, আয়াত : ৩১)।
গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা
ইসলাম শুধু গুনাহ নিষিদ্ধ করেনি, বরং গুনাহের কাছাকাছি যাওয়ার পথও বন্ধ করতে বলেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩২)
এই নীতি জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যে পরিবেশ, ওয়েবসাইট, বন্ধুমহল বা অভ্যাস গুনাহের দিকে টেনে নেয়, তা থেকে দূরে থাকা আত্মরক্ষার অংশ।
নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক মানুষের অন্তরকে জীবন্ত রাখে। আল্লাহর স্মরণ শয়তানের প্রভাব দুর্বল করে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা'দ, আয়াত : ২৮)
প্রতিদিন অল্প হলেও কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
ভুল হলে দ্রুত তাওবা
মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু গুনাহের পর তা লুকিয়ে রেখে অব্যাহত রাখা বিপজ্জনক। ইসলাম তাৎক্ষণিক তাওবার শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘গুনাহের পর আন্তরিক তাওবা এমন অনেক মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়, যেখানে সে গুনাহ না করলে হয়তো পৌঁছাতে পারত না।’ (মাদারিজুস সালিকীন)
আত্মসমালোচনার অভ্যাস
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হিসাব নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে।’ (আল-বাইহাকি, আয-যুহদুল কাবির)
প্রতিদিন কিছু সময় নিজের কাজ, কথা ও আচরণের মূল্যায়ন করলে গুনাহের পুনরাবৃত্তি কমে যায়।
গুনাহ থেকে বাঁচার সংগ্রাম একজন মুমিনের আজীবনের সাধনা। এই পথে কখনো হোঁচট আসতে পারে, কিন্তু থেমে থাকা নয়, ফিরে আসাই ইসলামের শিক্ষা। তাকওয়া, সালাত, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, সৎ সঙ্গ এবং আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর যারা আমার পথে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)
গুনাহ থেকে বাঁচার প্রকৃত শক্তি মানুষের নিজের মধ্যে নয়; বরং আল্লাহর সাহায্যের মধ্যেই নিহিত। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো তার রবের কাছে হিদায়াত, দৃঢ়তা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা।




