যে নারী ধাতব পাতায় এঁকেছিলেন আকাশের মানচিত্র

প্রতীকী ছবি
এক হাজার বছরেরও বেশি সময় আগের কথা। যখন ইউরোপের বহু অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার আলো ছিল সীমিত। তখনও মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোতে আকাশের নক্ষত্র নিয়ে চলছিল গভীর গবেষণা। সেই জ্ঞানচর্চার ভেতরেই ছিলেন একজন মুসলিম নারী, যিনি শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন না, বরং আকাশের হিসাবকে মানুষের হাতে তুলে দিতে তৈরি করেছিলেন সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। ধাতব পাতের ওপর নক্ষত্র, সময় ও দিকনির্দেশনার হিসাব খোদাই করা সেই যন্ত্রটি ছিল অ্যাস্ট্রোল্যাব। তার নাম মারিয়াম আল-অস্তুরলাবি। দশম শতকের এই মুসলিম নারী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণের দক্ষ কারিগর হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
আজকের যুগে স্যাটেলাইট, জিপিএস কিংবা আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীর অবস্থান নির্ণয়ের কথা কল্পনা করা কঠিন। অথচ শত শত বছর আগে অ্যাস্ট্রোল্যাব ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক উপকরণ। সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সময় ও অক্ষাংশ নির্ণয়, দিকনির্দেশনা, কিবলা নির্ধারণ এবং নৌযাত্রার বিভিন্ন হিসাব করতে এটি ব্যবহার করা হতো। গ্রিক ‘অ্যাস্ট্রোলাবোস’ শব্দ থেকে এসেছে ‘অ্যাস্ট্রোল্যাব’ নামটি। সময়ের পরিক্রমায় মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রাচীন এই যন্ত্রকে নিজেদের গবেষণা ও প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উন্নত ও বহুমুখী করে তুলেছিলেন।
এই বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যেরই একজন দক্ষ প্রতিনিধি ছিলেন মারিয়াম। তার জন্ম দশম শতকে সিরিয়ার আলেপ্পোয়। তার পিতা আল-ইজলি আল-অস্তুরলাবি ছিলেন অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণে দক্ষ ও পরিচিত কারিগর। পিতার কাছেই মারিয়ামের হাতে-কলমে শিক্ষার সূচনা। পরে নিজের মেধা, কারিগরি দক্ষতা ও সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণে স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জন করেন।
মারিয়ামের সময়ের আলেপ্পো ছিল মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর একটি। হামদানী শাসক সাইফ আদ-দৌলার দরবারেও জ্ঞানী, কবি, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের সমাগম ঘটেছিল। ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন তার ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য হিস্ট্রি অব সায়েন্স গ্রন্থে দশম শতকে আল-ইজলি পরিবারের সাইফ আদ-দৌলার দরবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছেন। এই পরিবেশে একজন মুসলিম নারীর বৈজ্ঞানিক কারিগরি জ্ঞানচর্চায় যুক্ত থাকা ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
তবে মারিয়ামকে নিয়ে আধুনিক সময়ে কিছু অতিরঞ্জিত তথ্যও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তাকে কখনো কম্পাসের আবিষ্কারক, আবার কখনো আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তির পূর্বসূরি হিসেবে তুলে ধরা হয়। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এসব দাবির সমর্থন পাওয়া যায় না। কম্পাসের ইতিহাস চীনের প্রাচীন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, আর জিপিএস আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের দীর্ঘ বিকাশের ফল। তাই মারিয়ামের প্রকৃত অবদানকে অতিরঞ্জিত করার প্রয়োজন নেই। অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণের কারিগরি ঐতিহ্যে তার দক্ষতা এবং মুসলিম নারী হিসেবে বিজ্ঞানচর্চায় তার উপস্থিতিই তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের মূল ভিত্তি।
মারিয়ামের জীবন ইসলামী সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও সামনে আনে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই সভ্যতা কেবল পুরুষদের হাতে গড়ে ওঠেনি। মুসলিম নারীরাও শিক্ষা, চিকিৎসা, সাহিত্য, ধর্মীয় জ্ঞান এবং বিজ্ঞানচর্চায় নিজেদের অবদান রেখেছেন। মারিয়াম আল-অস্তুরলাবি তাদের মধ্যকার সেইসব নারীর একজন, যাদের নাম সময়ের প্রবাহে অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
তার হাতে তৈরি অ্যাস্ট্রোল্যাব ছিল শুধু একটি ধাতব যন্ত্র নয়। এর রেখা ও সংখ্যার ভেতরে ছিল আকাশকে বোঝার মানুষের দীর্ঘ প্রচেষ্টা। আর সেই প্রচেষ্টায় একজন মুসলিম নারীর মেধা, শ্রম ও কারিগরি দক্ষতারও ছিল স্পষ্ট অংশগ্রহণ।
আজকের মুসলিম নারী যখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণার নতুন নতুন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন মারিয়াম আল-অস্তুরলাবির ইতিহাস তাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার তুলে ধরে। জ্ঞানচর্চার আকাশে নারীর উপস্থিতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু শতাব্দী আগেই আলেপ্পোর এক মুসলিম নারী ধাতব পাতের ওপর আকাশের মানচিত্র এঁকে রেখে গেছেন তার সেই উপস্থিতির সাক্ষ্য।
মারিয়ামের গল্প তাই শুধু একজন অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাতার গল্প নয়; এটি ইসলামী জ্ঞানসভ্যতায় মুসলিম নারীর মেধা, দক্ষতা ও বিজ্ঞানচর্চার এক বিস্মৃত অধ্যায়ের গল্প।



