হতাশ হৃদয়ের জন্য কোরআনের আশার আলো

প্রতীকী ছবি
জীবনের কোনো কোনো রাত এত দীর্ঘ হয় যে, ভোরের কথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। মানুষ তখন চারপাশে তাকিয়ে শুধু বন্ধ দরজা দেখতে পায়। যে স্বপ্নটি নিয়ে এতদিন ছুটে চলেছিল, সেটি হয়তো ভেঙে গেছে। বহু চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। প্রিয় মানুষটি দূরে সরে গেছে। অর্থনৈতিক সংকট ঘরের প্রতিটি কোণে অস্থিরতার ছায়া ফেলেছে। কিংবা নিজের কোনো ভুল, কোনো গুনাহ, কোনো অতীতের সিদ্ধান্ত বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—‘তোমার আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।’
তখন মানুষ কখনো কখনো নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলে, ‘আমার জন্য আর কিছুই বাকি নেই।’
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই কোরআন মানুষের সামনে আরেকটি দরজা খুলে দেয়। যে দরজার ওপারে আছে আশা। আছে ক্ষমা। আছে নতুন করে শুরু করার সুযোগ। আছে এমন এক রবের আশ্বাস, যিনি বান্দার ভাঙা হৃদয়ের কথাও জানেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)
আয়াতটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো, আল্লাহ গুনাহগার মানুষকেও ‘আমার বান্দা’ বলে ডাকছেন। অর্থাৎ মানুষ যত দূরেই সরে যাক, তাওবার পথ তার জন্য বন্ধ হয়ে যায় না। অতীত যত অন্ধকারই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিস্তৃত।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এমন কিছু লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসেছিল, যারা বহু হত্যা ও অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়েছিল। তারা জানতে চেয়েছিল, তাদের জন্য তাওবার কোনো সুযোগ আছে কি না। এ প্রসঙ্গে এই আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে।
অতএব, কোনো গুনাহের কারণে যদি হৃদয় ভারী হয়ে যায়, তখন শয়তানের কথায় বিশ্বাস করে নিজেকে শেষ মনে করার প্রয়োজন নেই। বরং তাওবার দরজা খুলে দিতে হবে। কারণ আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য নিখুঁত অতীতের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন একটি সত্যিকার অনুতপ্ত হৃদয়।
আবার কখনো হতাশার কারণ গুনাহ নয়, ব্যর্থতা। মানুষ চেষ্টা করেছে, পরিশ্রম করেছে, দোয়া করেছে, তবু কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। একটি দরজা বারবার বন্ধ হয়েছে। তখন মনে হয়, ‘হয়তো আমার জন্য সফলতা লেখা নেই।’
তখনও পবিত্র কোরআন তখন বলে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আলইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)
একই সত্য দুবার উচ্চারণ করে কোরআন যেন হতাশ হৃদয়কে থামিয়ে দিয়ে বলছে, কষ্টকে চূড়ান্ত সত্য মনে করো না। আজকের ব্যর্থতা তোমার পুরো জীবনের পরিচয় নয়। আজকের অন্ধকার আগামী দিনের আলোকে বাতিল করে দেয় না।
এ কারণেই একজন মুমিনের জীবনে বিপর্যয় এলেও সে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। সে কাঁদে, কিন্তু আশা হারায় না। সে ব্যথা অনুভব করে, কিন্তু রবের প্রতি আস্থা হারায় না।
কারণ সে জানে, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
এই আয়াতের অর্থ এই নয় যে মুমিনের জীবনে কোনো অসহনীয় অনুভূতি বা কঠিন পরীক্ষা আসবে না। বরং এটি তাকে তার রবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রাখতে শেখায়। মানুষ নিজের বর্তমান মুহূর্তটুকুই দেখে; আল্লাহ দেখেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মানুষ জানে একটি ঘটনার কষ্ট; আল্লাহ জানেন সেই ঘটনার পূর্ণ পরিণতি।
তাই যখন কোনো পরিস্থিতি আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, ‘তুমি একা’, তখন কোরআনের আরেকটি আয়াত মনে করা দরকার—‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)
মানুষ অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে কত জায়গায় ছুটে যায়। কেউ অর্থের মধ্যে শান্তি খোঁজে, কেউ মানুষের স্বীকৃতিতে, কেউ বিনোদনে, কেউ একাকিত্ব থেকে পালাতে নিজেকে নানা ব্যস্ততায় ডুবিয়ে রাখে। অথচ হৃদয়ের গভীরতম শূন্যতা সবসময় বাহ্যিক কোনো আয়োজন দিয়ে পূরণ হয় না। যিকির, কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার ও দোয়া মানুষকে তার স্রষ্টার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত দোয়ায় তিনি দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণের বোঝা এবং মানুষের দ্বারা পরাভূত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন। অর্থাৎ দুশ্চিন্তা থাকা ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়; দুশ্চিন্তার সময় কার কাছে ফিরে যাওয়া হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কখনো আবার মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হয় এই অনুভূতি—‘আল্লাহ কি আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন?’
এ প্রশ্নের উত্তর যেন সুরা আদ-দুহার একটি আয়াত হয়ে আসে: ‘তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি অসন্তুষ্টও হননি।’ (সুরা দুহা, আয়াত : ৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের এক কঠিন সময়ে এই সান্ত্বনার আয়াত নাজিল হয়েছিল। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, এক সময় তিনি অসুস্থতার কারণে কয়েক রাত তাহাজ্জুদে উঠতে পারেননি। তখন তাঁকে কষ্টদায়ক কথা বলা হয়। এরপর আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে এই আয়াত নাজিল করেন।
কী গভীর শিক্ষা! কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আসতে দেরি হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। কোনো দোয়া যেন আকাশের ওপারে পৌঁছাচ্ছে না বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু নীরবতা মানেই পরিত্যাগ নয়। বিলম্ব মানেই প্রত্যাখ্যান নয়।
বরং কখনো কখনো যে দরজাটিকে আমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া মনে করি, সেটিই আমাদের জন্য রক্ষা হয়ে আসে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ২১৬)
মানুষ বর্তমান দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, আল্লাহ জানেন পরিণতি। তাই কোনো চাকরি না পাওয়া, কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, কোনো সুযোগ হাতছাড়া হওয়া কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া সবসময় জীবনের পরাজয় নয়। অনেক সময় মানুষ বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারে, ‘সেদিন যা হারিয়েছিলাম, সেটিই হয়তো আমাকে আরও বড় ক্ষতি থেকে বাঁচিয়েছিল।’
এই বিশ্বাসই মুমিনকে বিপদের মধ্যেও স্থির রাখে।
আর যদি সমস্যা এত গভীর হয় যে মনে হয়, ‘এখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই’, তখনও পবিত্র কোরআন বলে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২-৩)
আমরা যে পথ দেখতে পাচ্ছি না, তার অর্থ এই নয় যে কোনো পথ নেই। আমাদের দৃষ্টির সীমা আছে; আল্লাহর রহমতের সীমা নেই।
তাই বিপদের সময় শুধু সমস্যার দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, সমস্যার মালিকের দিকেও তাকাতে হবে।
এমনকি পরাজয়ের পরও কোরআন মুমিনকে ভেঙে পড়তে দেয় না। উহুদের কঠিন পরিস্থিতির পর আল্লাহ বলেছিলেন, ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৯)
একটি ব্যর্থতা একজন মানুষকে ব্যর্থ মানুষ বানিয়ে দেয় না। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল পুরো জীবনকে ব্যর্থ করে না। ব্যবসায় ক্ষতি মানে ভবিষ্যৎ শেষ নয়। কোনো সম্পর্কের বিচ্ছেদ মানে ভালোবাসার সব দরজা বন্ধ নয়।
মুমিন পড়ে যেতে পারে, কিন্তু পড়ে থাকাকে নিজের নিয়তি মনে করে না।
হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবন এই আশার অসাধারণ উদাহরণ। প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদ তাঁকে গভীরভাবে কাঁদিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। কিন্তু সেই বেদনার মধ্যেও তিনি সন্তানদের বলেছিলেন, ‘তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)
অর্থাৎ চোখে পানি থাকা আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এক জিনিস নয়।
মানুষ কাঁদতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে। নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারে। কিন্তু তার হৃদয়ের শেষ আশ্রয়টি যেন আল্লাহর কাছেই থাকে।
হিজরতের সেই ঘটনাটি যেন এই সত্যকে আরও গভীর করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.) যখন গুহায় ছিলেন, শত্রুরা তাদের এত কাছে চলে এসেছিল যে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০)
এই কয়েকটি শব্দ যেন বিপন্ন মানুষের জন্য এক অনন্ত আশ্বাস:
‘আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’
যখন মনে হবে কেউ পাশে নেই, মনে করুন তিনি আছেন।
যখন মনে হবে কোনো পথ নেই, মনে করুন তিনি পথ দেখাতে পারেন।
যখন মনে হবে সব শেষ, মনে করুন তাঁর রহমত এখনো বাকি।
আর যখন নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে মনে হবে আপনি ক্ষমার অযোগ্য, তখন আবার শুনুন তাঁর সেই আহ্বান—‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’
তাই হতাশার সময় শুধু পরিস্থিতির হিসাব করবেন না। নিজের জীবনের বন্ধ দরজাগুলো গুনে গুনে কষ্ট বাড়াবেন না। বরং কোরআনের দিকে ফিরে যান। আয়াতগুলো শুধু পড়বেন না, তাদের অর্থ হৃদয়ে ধারণ করুন।
দুশ্চিন্তা এলে দোয়া করুন। গুনাহ হলে তাওবা করুন। ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করুন। পথ বন্ধ হলে অন্য পথ খুঁজুন। আর কোনো কিছুই যখন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, তখন নিজের হৃদয়টিকে আল্লাহর হাতে তুলে দিন।
মনে রাখবেন, রাত যত দীর্ঘই হোক, রাতের নিজস্ব কোনো সূর্য নেই; ভোরের সূর্যই তাকে সরিয়ে দেয়।
আপনার জীবনেও হয়তো এখন একটি দীর্ঘ রাত চলছে। কিন্তু সেই রাতই শেষ সত্য নয়।
কারণ পবিত্র কোরআন বলছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)
আর সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে একজন মুমিনের হৃদয়ে যে কথাটি আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারে, তা হলো:
‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)
হয়তো সবকিছু এখনো ঠিক হয়ে যায়নি। হয়তো আপনার দোয়ার উত্তরও এখনো আসেনি। কিন্তু তাই বলে গল্প শেষ হয়ে যায়নি।
আপনার রব এখনো আছেন। আর যতক্ষণ আল্লাহ আছেন, ততক্ষণ একজন মুমিনের জীবনে আশার দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail



