লাইকের নেশা ও আত্মপ্রদর্শন: ইসলাম কী বলে?

প্রতীকী ছবি
একসময় মানুষের স্বীকৃতির পরিসর ছিল পরিবার, প্রতিবেশী বা কর্মস্থল। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই পরিসরকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করেছে। একটি ছবি, একটি ভিডিও কিংবা একটি স্ট্যাটাস মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই বাস্তবতায় ‘লাইক’, ‘ফলোয়ার’ ও ‘ভিউ’ অনেকের কাছে শুধু সংখ্যাই নয়, বরং আত্মমূল্যায়নের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা, স্বীকৃতির প্রতি অস্বাভাবিক নির্ভরতা এবং লোকদেখানো সংস্কৃতি। ইসলাম এ বিষয়ে কী দিকনির্দেশনা দেয়, তা আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ইসলাম মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অন্তরের বিশুদ্ধতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তাদেরকে এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)
এই আয়াতে ‘মুখলিসীন’ অর্থাৎ একনিষ্ঠতার কথা বলা হয়েছে। ইবাদত হোক কিংবা মানবকল্যাণমূলক কাজ, তার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। যদি মানুষের প্রশংসা প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তবে আমলের প্রকৃত মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি, হাদিস: ১; মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭)
এই হাদিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কেউ যদি ইসলামের দাওয়াত, জ্ঞান বিতরণ বা মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে কোনো বিষয় প্রচার করেন, তবে তা সওয়াবের কাজ হতে পারে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, প্রশংসা অর্জন বা অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা, তবে নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
রিয়া: আত্মপ্রদর্শনের আধ্যাত্মিক বিপদ
ইসলামে লোক দেখানো আমলকে ‘রিয়া’ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া (লোক দেখানো)।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)
রিয়া সবসময় মসজিদে নামাজ পড়া বা দান-সদকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজ এটি ডিজিটাল জীবনেও প্রবেশ করেছে। ইবাদতের ছবি, দানের ভিডিও কিংবা ব্যক্তিগত নেক আমল যদি কেবল মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য প্রকাশ করা হয়, তবে তা আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অহংকার ও আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম সম্পর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসিতা, সম্পদ বা ব্যক্তিগত অর্জন এমনভাবে প্রদর্শন করা হয়, যা অন্যের মনে হীনমন্যতা বা ঈর্ষা সৃষ্টি করতে পারে। ইসলাম বিনয়কে ঈমানের সৌন্দর্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘পৃথিবীতে অহংকারভরে চলাফেরা করো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ৯১)
এখানে অহংকার শুধু কথাবার্তা বা আচরণে নয়, বরং নিজের জীবনকে এমনভাবে উপস্থাপন করাও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যাতে অন্যদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা প্রকাশ পায়।
মানুষের দৃষ্টি নয়, আল্লাহর দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের আকৃতি ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
এই হাদিস মুসলিমদের জন্য একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দেয়। মানুষের করতালি নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড।
আধুনিক মুসলিম স্কলারদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশিষ্ট আলেম ড. ইয়াসির কাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের উপস্থিতি নিয়ে একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, ডিজিটাল মাধ্যম নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এটি একটি ‘টুল’। এর মাধ্যমে দাওয়াত, শিক্ষা ও কল্যাণ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তবে তিনি সতর্ক করেন, যখন একজন মানুষ নিজের মূল্যকে লাইক, শেয়ার বা ফলোয়ারের সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তখন তার নিয়ত ও আত্মিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মিশরীয় দাঈ ড. ওমর সুলায়মান বলেছেন, একজন মুসলিমের উচিত প্রতিদিন নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করা, ‘আমি কি এই পোস্টটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দিচ্ছি, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?’ তার মতে, আত্মসমালোচনা (মুহাসাবাহ) ডিজিটাল যুগে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. মুহাম্মদ রাতিব আন-নাবুলসি বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জন্য নিয়ামত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু একই প্রযুক্তি আত্মপ্রদর্শন, অহংকার ও রিয়ার মাধ্যম হয়ে গেলে তা নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম কি সব ধরনের প্রকাশ নিরুৎসাহিত করে?
এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ইসলাম সব ধরনের প্রকাশকে নিষিদ্ধ করেনি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭১)
অর্থাৎ কোনো ভালো কাজ অন্যদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা বৈধ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে একটি উত্তম রীতি চালু করে, সে তার সওয়াব পাবে এবং যারা তা অনুসরণ করবে, তাদের সওয়াবও পাবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০১৭)
অতএব মূল প্রশ্ন প্রকাশ নয়, বরং উদ্দেশ্য। যদি উদ্দেশ্য হয় মানুষকে অনুপ্রাণিত করা, তবে তা প্রশংসনীয়। আর যদি উদ্দেশ্য হয় আত্মপ্রচার, তবে তা আত্মিক বিপদের কারণ।
ডিজিটাল যুগে মুসলিমের করণীয়
* প্রতিটি
পোস্টের আগে নিজের নিয়ত যাচাই করা।
* ব্যক্তিগত ইবাদত ও নেক আমল অকারণে
প্রচার না করা।
* বিলাসিতা ও ভোগবাদের প্রদর্শন থেকে
বিরত থাকা।
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দাওয়াত,
জ্ঞান ও মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহার করা।
* নিজের মূল্যকে লাইক,
কমেন্ট বা ফলোয়ারের সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত
না করা। প্রকৃত সম্মান আল্লাহর কাছেই।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একজন মুসলিমের পরিচয় নির্ধারণ করবে না তার ফলোয়ার সংখ্যা, বরং তার তাকওয়া, ইখলাস ও উত্তম চরিত্র। কুরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)। তাই ক্ষণস্থায়ী ভার্চুয়াল প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর স্থায়ী সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com






