ইসলামের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প ও তা থেকে পরিত্রাণের উপায়
- কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ভূমিকম্পের তাৎপর্য

সংগৃহীত ছবি
ভূমিকম্প মানুষের জন্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার নাম। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনই হাজারো প্রাণহানি, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদরা এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ, ভূত্বকের চাপ ও শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে এটি ঘটে থাকে। ইসলামও এসব প্রাকৃতিক কারণকে অস্বীকার করে না। তবে একজন মুমিনের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প কেবল একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন, মানুষের আত্মসমালোচনার উপলক্ষ এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার আহ্বান।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি তো নিদর্শনসমূহ এজন্যই পাঠাই, যাতে তারা ভীত হয়।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৫৯)। অর্থাৎ পৃথিবীতে সংঘটিত বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি জাগ্রত করার মাধ্যম। এগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তি ও সভ্যতার যত উন্নতিই হোক, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহরই হাতে।
মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ‘বলুন, তিনি তোমাদের ওপর থেকে কিংবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে শাস্তি পাঠাতে সক্ষম।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৬৫)। এ আয়াত নাজিল হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে এমন শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন (বুখারি, হাদিস : ৪৬২৮)। অনেক মুফাসসির ‘পায়ের নিচ থেকে শাস্তি’ বলতে ভূমিকম্প, ভূমিধস ও ভূমি ধসে যাওয়ার মতো বিপর্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে কোনো ব্যক্তি বা জাতির গুনাহের শাস্তি বলে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহর ফয়সালার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তিনিই জানেন। একই ঘটনা কারও জন্য পরীক্ষা, কারও জন্য সতর্কবার্তা এবং কারও জন্য শাহাদাতের মর্যাদা লাভের কারণ হতে পারে। তাই দুর্যোগকে কেন্দ্র করে মানুষকে দোষারোপ করা নয়, বরং নিজের আমল পর্যালোচনা করাই ইসলামের শিক্ষা।
তবুও পবিত্র কোরআন মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলে, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মেরই ফল। তবে তিনি অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৩০)। অন্য এব আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে কল্যাণ তোমার কাছে আসে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে; আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে আসে, তা তোমার নিজের থেকেই।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৭৯)। এসব আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের শিক্ষা দেয়।
প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন, আল্লাহ কখনো কখনো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে মানুষের হৃদয়ে ভীতি সৃষ্টি করেন, যাতে তারা পাপ থেকে ফিরে এসে তাওবা করে এবং তাঁর আনুগত্যে ফিরে আসে। (ইগাসাতুল লাহফান)
ভূমিকম্প থেকে পরিত্রাণের ইসলামী উপায়
১. আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার : দুর্যোগের সময় একজন মুমিনের প্রথম করণীয় হলো আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। পাপ থেকে বিরত থাকা, তাওবা করা এবং ইস্তিগফার করা আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দ্বার খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৯৬)
২. বেশি বেশি দোয়া, জিকির ও নফল ইবাদত : রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্যগ্রহণের মতো আল্লাহর নিদর্শন দেখা দিলে মানুষকে নামাজ, দোয়া, জিকির ও ইস্তিগফারে মনোযোগী হতে নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস: ১০৪৪, ১০৫৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯০১)। আলেমরা বলেন, অন্যান্য ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও একইভাবে আল্লাহর স্মরণে আত্মনিয়োগ করা উচিত।
৩. দান-সদকা ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো : দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪১; তিরমিজি, হাদিস: ১৯২৪)
খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর সময় ভূমিকম্প হলে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নরদের মানুষকে দান-সদকা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, বিপদের সময় সামাজিক সহমর্মিতা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন।
৪. অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত থাকা : সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি, জুলুম, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মিথ্যাচার ও মানুষের অধিকার হরণের মতো অপরাধ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। তাই ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং সৎকাজের প্রসার ঘটানো জরুরি। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৭১)
৫. বাস্তব প্রস্তুতি গ্রহণ : ইসলাম কখনো শুধু আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির কথা বলে না; বরং বাস্তব কারণ অবলম্বনেরও নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে পরিকল্পনা ও সতর্কতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাই ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, বিল্ডিং কোড মেনে চলা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ, উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি ইসলামের ‘আসবাব গ্রহণ’ নীতিরই অংশ। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা নয়।
ভূমিকম্প আমাদের সামনে সেই বাস্তবতা তুলে ধরে যে, পৃথিবীর সব শক্তি ও স্থায়িত্বের ঊর্ধ্বে রয়েছেন মহান আল্লাহ। মানুষ যত শক্তিশালী প্রযুক্তিই নির্মাণ করুক না কেন, এক মুহূর্তের কম্পনে তার অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো দুর্যোগকে আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা, তাওবা-ইস্তিগফারে মনোযোগী হওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এভাবেই ঈমান, আমল ও প্রয়োজনীয় সতর্কতার সমন্বয়ে ব্যক্তি ও সমাজ আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন, আমাদের অন্তরকে তাঁর আনুগত্যে দৃঢ় রাখুন এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




