রাস্তাঘাট পরিষ্কার করেন রায়হান

সড়কের আবর্জনা পরিষ্কার করছেন রায়হান মিয়া। ছবি: আগামীর সময়
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্লাস শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্কুল পরিষ্কার করাতেন শিক্ষকরা। হাতমুখ ধোয়ার পর জাতীয় পতাকার সামনে সারিবদ্ধভাবে মাঠে দাঁড় করিয়ে গাওয়াতেন জাতীয় সংগীত। এরপর শুরু হতো ক্লাস। শৈশবের স্কুল পরিষ্কারের এ শিক্ষা থেকে গড়ে ওঠে নিজ ঘরবাড়ি ও এলাকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস। তাই ষাটোর্ধ্ব বয়সেও রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখলে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না রায়হান মিয়া।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বড়বাজার এলাকার শহীদ মিনারের দক্ষিণে বানিয়াচং থানা অভিমুখী সড়কের কিছু অংশে আটকে ছিল বৃষ্টির পানি। যানবাহনের গাড়ির চাকায় ময়লা পানি ছিটকে পড়ছিল পথচারীদের গায়ে। দুই যুবককে সঙ্গে নিয়ে কোদাল, বেলচা ও ঝুড়ি নিয়ে সড়কের পাশে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্যসহ ময়লা-আবর্জনা অপসারণের মাধ্যমে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করলেন রায়হান মিয়া। পরে মুক্তিযোদ্ধা চত্বরসহ আশপাশে আবর্জনাও করলেন পরিষ্কার। এভাবে সবসময় স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন তিনি। সম্প্রতি এক দুপুরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চালানোর সময় এসব কথা জানালেন রায়হান মিয়া।
বানিয়াচং উপজেলার উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের রায়হান মিয়া জানালেন, তিনি শুধু রাস্তাঘাট এবং রাস্তার পাশের ড্রেন পরিষ্কারের কাজই করেন না। রাস্তার পাশে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণসহ মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করেন।
রায়হানের ভাষ্য, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার রোপণ ও বিতরণ করা গাছের চারার পরিমাণ ৫০ হাজারের বেশি। ছয় বছর আগে হবিগঞ্জ-বানিয়াচং, হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের পাশে প্রায় পাঁচ হাজার তালের বীজ রোপণ করেছেন; যেগুলো থেকে শত শত গাছ বেড়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ফলে তাদের কাছে তিনি ‘গাছ মামা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বলেও জানালেন রায়হান। এ ছাড়া আহত পাখির সেবা দিয়ে সুস্থ করে অবমুক্ত করেন।
এসব কাজ করতে গিয়ে তার যে খরচ হয়, সেজন্য ফ্রান্সপ্রবাসী ছোট ভাই শাহজাহান মিয়া; ইংল্যান্ড প্রবাসী ছোট বোন নাসমিন বেগমসহ ভাতিজা-ভাতিজি-ভাগনে-ভাগনিরা সহযোগিতা করেন। এ ছাড়া, অন্য কেউ টাকাপয়সা দিতে চাইলে তিনি নেন না।
রায়হান মিয়ার বড় বোন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক আছিয়া বেগম বললেন, “আমার এই ভাইটি ছোটবেলা থেকে ‘নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানো’ স্বভাবের। জীবনে বিয়ে-শাদি পর্যন্ত করেনি। ১৯৮৫ সালে তাকে কাতার পাঠিয়েছিলাম। সেখানে থাকাকালেও নিজের উপার্জনের বেশিরভাগ অর্থ সেখানকার বাংলাদেশিদের উপকারে খরচ করত। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় বিদেশ থেকে বাংলাদেশের বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি ত্রাণ তহবিলে একবার এক লাখ এবং আরেকবার দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ২০১২ সালে দেশে এসে ছোটবেলার মতো স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তাঘাট পরিষ্কারসহ বৃক্ষরোপণ, আহত পাখির সেবা দিয়ে সুস্থ করার পর অবমুক্ত করে যাচ্ছে। আমরা তার এসব কাজে অত্যন্ত খুশি হয়ে উৎসাহ জোগাই।”
বানিয়াচং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খান বললেন, সমাজ থেকে স্বেচ্ছাশ্রম যখন হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, এমন পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাশ্রমে রায়হান মিয়ার জনহিতকর কাজ সত্যিই আশাব্যঞ্জক।



