স্পেন জিততে চায় মাঝমাঠে

লামিন ইয়ামাল
থার্মোপলির যুদ্ধে স্পার্টার রাজা লিওনিদাস যেভাবে অল্প কিছু সৈনিক নিয়ে পারস্যের সম্রাট জার্জিসের বিশাল সেনাবাহিনীকে রুখে দিয়েছিলেন, সেই ইতিহাস এখনো মানুষের মুখে মুখে। প্রাকৃতিক গিরিখাত, ঝড় আর ছোট তবে প্রশিক্ষিত একদল সৈনিককে নিয়ে ১৪ গুণ বড় সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন লিওনিদাস। তা না হলে বদলে যেত ইউরোপের ইতিহাস।
বিশ্বকাপের ফাইনালে লিওনেল মেসিকে আটকাতে লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে হয়তো ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের কাছেই। স্পেনের কোচ তার তরুণ বাহিনী নিয়ে বিশ্বকাপে থামিয়ে দিয়েছেন ‘ফরাসি বিপ্লব’, এবার মেসি নামের ‘জিন’কে কলসের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে পারলেই ইউরোপের পর বিশ্বটাই জয়ে করে ফেলতে পারবে স্প্যানিয়ার্ডরা। কোচেস ভয়েস ইউটিউব চ্যানেলে, ইউরোর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন সেটা ব্যাখ্যা করেছেন দে লা ফুয়েন্তে। তার কথায় উঠে এসেছে ম্যাচের বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি পূর্বানুমান করে সেই সব ‘বিপদ’ এড়ানোর সব প্রস্তুতির কথা। ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, চারজন ডিফেন্ডারের পাশাপাশি আরও দুজন মিডফিল্ডারকে পিভট হিসেবে ব্যবহার করার কথা, কারণ তিনি রক্ষণটা জমাট রাখতে চেয়েছেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ক্লান্ত করতে চেয়েছেন আর উইঙ্গারদের জায়গা বদলের অনুশীলন করিয়েছেন যেটা ম্যাচে কাজে দিয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল সামনে রেখে নিশ্চয়ই পরীক্ষিত কৌশলেই দল সাজানোর পরিকল্পনা করবেন ফুয়েন্তে। যে প্রক্রিয়ায় সফল হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত এসেছেন ‘লা ফিউরিয়া রোহা’দের নিয়ে, শেষবেলায় তাতে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইবেন না কোনো কোচই।
হারের পর ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলেছেন, ‘ওরা সব জায়গা বন্ধ করে দিয়েছিল।’ অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ‘আমরা সেটাই করেছি যেটা আমরা সবচেয়ে ভালো পারি। শৃঙ্খলা, মাঠে গুছিয়ে খেলা, ত্যাগ স্বীকার করা, দায়বদ্ধতা দেখানো, সেরাটা দেওয়ার প্রচেষ্টা... ছেলেরা জানে আক্রমণে গেলে কী করতে হয় আর রক্ষণে কী করতে হয়। আমরা একাডেমিতে যা করেছি, তারই ফল হচ্ছে এই জয় (ফ্রান্সের বিপক্ষে), যার কৃতিত্ব স্পেনের সব ফুটবল কোচের।’
স্পেনের ফুটবল কোচিংয়ের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে ‘রন্দো’, বৃত্তাকারভাবে পাঁচ কিংবা আটজনকে নিয়ে একটি অনুশীলন; যেটা শৈশব থেকেই স্পেনের খুদে ফুটবলারদের শেখানো হয়। পাঁচজনের বৃত্তে এক বা আটজনের বৃত্তে দুই, এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের অত্যন্ত কম জায়গায় বল রিসিভ করা, শরীরের পজিশন ঠিক রাখা এবং ওয়ান-টাচ পাসে বল বের করে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা তৈরি করে। স্পেনের একাডেমিগুলোতে আলাদা করে কোনো শারীরিক সক্ষমতার জন্য অনুশীলন করানো হয় না, সবটাই হয় বল পায়ে আর শুরুর দিকের বয়সে খেলোয়াড়দের সুনির্দিষ্ট কোনো পজিশনও থাকে না। ফুয়েন্তের দলে মিকেল মেরিনো, উনাই সিমন, ফাবিয়ান রুইস, ওলমো, কুকুরেয়া, পেদ্রি, মাইকেল ওয়ারসাবালরা বয়সভিত্তিক বিভিন্ন পর্যায়ে খেলেছেন দে লা ফুয়েন্তের অধীনে। তার জন্য জীবন বাজিও রাখতে পারেন এই ফুটবলাররা। যে কারণে দারুণ ট্যাকটিশিয়ান হওয়ার পাশাপাশি দুর্দান্ত একটা দলও পেয়েছেন স্প্যানিশ কোচ, কিংবা বলা যায় গড়ে তুলেছেন নিজের হাতে!
ফ্রান্সের আক্রমণভাগে বল জোগানোর মূল কাজটা ছিল মাইকেল ওলিসের। স্পেনের রুইস ও রোদ্রি ডাবল পিভট হিসেবে রক্ষণ এবং মাঝমাঠের ফাঁকা জায়গায় (পকেট স্পেস) ওলিসের দিকে আসা পাসের জোগান বন্ধ করেছেন। ওলিসে যখনই বল স্পর্শ করতে গেছেন, কুকুরেয়া, লাপোর্তে কিংবা রোদ্রি দ্রুত তার কাছে চলে গেছেন। ম্যাচে ৭৭ মিনিট খেলেছেন ওলিসে, এর মধ্যে ২০ বার তার কাছ থেকে বল ছুটেছে। মেসিকে থামাতে হয়তো এরকম কিছু করবেন ফুয়েন্তে, তাকে রাখবেন কড়া পাহারায়। কিন্তু যে স্প্যানিশ একাডেমির শিক্ষায় ফুয়েন্তের শিষ্যদের বেড়ে ওঠা, সেই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনই তো মেসি! অল্প জায়গায় বল নিয়ে টার্ন করা, বলের ওপর অবিশ্বাস্য দখল ও বল পায়ে তীব্রগতিতে ড্রিবল করে বেরিয়ে যাওয়া— সবকিছুতেই মেসি সেরা এবং অভাবনীয়। ফুয়েন্তেকে তাই মেসিকে আটকাতে প্রথাগত কৌশলের বদলে অন্যরকম কিছুই ভাবতে হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মেসিকে আটকানোর ছক আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বহু কোচই করেছেন, সফল হয়েছেন হাতেগোনা অল্প কয়েকজন।




