আমার মেদিনীমন্ডল

ইমদাদুল হক মিলন। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছেলেবেলার বারোটি বছর আমার কেটেছে বিক্রমপুরের মেদিনীমন্ডল গ্রামে, নানির কাছে। গ্রামটি বিশাল, দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তর মেদিনীমন্ডল ও দক্ষিণ মেদিনীমন্ডল। আমার নানাবাড়ি উত্তর মেদিনীমন্ডলে। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থে কী যেন কী কারণে এই গ্রামটির নাম নেই। অন্য লেখকদের লেখায় মেদিনীমন্ডলের নাম পাওয়া যায়। উত্তর মেদিনীমন্ডলের নামকরা মানুষ আলতাবউদ্দিন সারেং আমার নানা। সেই বাড়ির বাগানের দিককার একটি আমগাছের তলায় আমার নাড়ি পোঁতা। এ কারণেই নাকি গ্রামের গাছপালা, চক, মাঠ, বিল আর মানুষজন দেখে বড় হওয়ার কারণে গ্রামটির প্রতি আমার মমত্ব অপরিসীম। আসলে বিক্রমপুরের জন্যই আমার সীমাহীন ভালোবাসা। যদিও বিক্রমপুর নামটি এখন আর সরকারি নথিপত্রে নেই, আছে মানুষের মুখে মুখে আর স্মৃতিতে, আছে ইতিহাসে। প্রাচীন আমলে বিক্রমপুর কয়েকবার প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল। নিকট অতীতেও লোকে বলত ঢাকা-বিক্রমপুর। তখন ঢাকা জেলার দুই মহকুমার একটি ছিল মুন্সীগঞ্জ। এখন মুন্সীগঞ্জ হয়ে গেছে জেলা। এ প্রজন্মের মানুষ বিক্রমপুর না বলে মুন্সীগঞ্জই বলে।
মেদিনীমন্ডল লৌহজং থানার গ্রাম। গ্রামের দক্ষিণে মাওয়া। পদ্মা সেতুর জন্য যে মাওয়া এখন বিশেষভাবে পরিচিত।
মেদিনীমন্ডলের সবচেয়ে বড় ও অভিজাত পরিবার খান সাহেবরা। তাদের বাড়ির নাম ‘খানবাড়ি’। ব্রিটিশ আমল থেকে এ বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা গ্রাম শাসন করতেন ও উচ্চশিক্ষিত হয়ে সরকারি বড় বড় পদ অলংকৃত করতেন। ষাটের দশকের শুরুতে খানবাড়ির সিরাজ খান সাহেব ছিলেন গ্রামের চেয়ারম্যান। প্রবল আভিজাত্য ছিল তার। গ্রামের বিচার-সালিশে যেতেন নিজস্ব ঘোড়ায় চড়ে। একবার আমার নানাবাড়ি এসেছিলেন তিন শরিকের বিবাদ মেটাতে। হাতলঅলা চেয়ারে বসেছিলেন। আমার নানি সিন্দুকে তুলে রাখা চায়ের পেয়ালা আর তস্তুরি বের করেছিলেন চেয়ারম্যান সাহেবকে চা দেওয়ার জন্য। রান্নাঘরে দুধচা তৈরি হচ্ছে। চায়ের সেই অপূর্ব ঘ্রাণখানি এখনো আমার নাকে এসে লাগে।
খানবাড়ির কে এম আমিনুল ইসলাম খান সাহেব এয়ার ভাইস মার্শাল ছিলেন। এরশাদ আমলে হয়েছিলেন মন্ত্রী। বাংলাদেশ সরকারের বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এখন যে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে পদ্মা সেতুতে গিয়ে উঠেছে, সত্তরের দশকেও এদিকটায় ছিল নিচু হালট। ঢাকা থেকে লঞ্চে শ্রীনগর নেমে সেই হালট দিয়ে হেঁটে হেঁটে বহুবার আমি মেদিনীমন্ডলে গিয়েছি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা-মাওয়া খুলনা মহাসড়কের পরিকল্পনা করা হয়। সেই বছর ১৪ মার্চ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উত্তর মেদিনীমন্ডলে আসেন। কে এম আমিনুল ইসলাম খান ছিলেন তার সঙ্গে। এখন যেখানটায় মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজা, সেদিকটায় ছিল কে এম আমিনুল ইসলাম খানের মায়ের জমি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল ধরে সেই জমির মাটি কেটে ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের উদ্বোধন করেছিলেন।
খানবাড়ির আরেক কৃতী সন্তান স্কোয়াড্রন লিডার এম হামিদুল্লাহ খান একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তার অনুজপ্রতিম এম আতিকউল্লাহ খান মাসুদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী, প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন। একাত্তরে মেদিনীমন্ডলের ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা। এই গ্রামে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী ছিল না।
মেদিনীমন্ডলের বাড়িগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন খানবাড়ি, কাজিবাড়ি, ব্যাপারীবাড়ি, ফকিরবাড়ি, সারেংবাড়ি, হাওলাদারবাড়ি, দারোগাবাড়ি, চৌধুরীবাড়ি, মিয়াবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি— এই রকম। আমার নানাবাড়ি হচ্ছে ‘মেন্দাবাড়ি’। এই পদবির মানুষদের তিনটা বাড়ি গ্রামে। খানবাড়ির পাশে ‘বড় মেন্দাবাড়ি’। আরেকটা বাড়ি হচ্ছে ‘পুরানবাড়ি’। আমার নানাবাড়ি হচ্ছে শুধুই ‘মেন্দাবাড়ি’। মেন্দা পদবির কথা আমি আর কখনো কোথাও শুনিনি। এই অদ্ভুত পদবির পেছনে একটা গল্প আছে। বংশের পূর্বপুরুষদের কেউ একজন প্রতিবেশীদের নামে বিচার দেওয়ার জন্য গ্রামপ্রধানের কাছে গিয়েছে, সেই ব্যক্তির প্রবল ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হয়ে সে তোতলাতে লাগল, যা বলতে এসেছে বলতে তো পারছেই না, মিনমিন করছে। গ্রামপ্রধান বিরক্ত হয়ে তাকে একটা ধমক দিলেন। ‘এই লোকটা মিনমিন করে কী বলছে, বুঝতেই পারছি না। মেন্দাটাকে বিদায় করো।’ তার মানে মিনমিন থেকে মেন্দা শব্দের উৎপত্তি। সেই লোকের কারণে একটি বংশের পদবিই হয়ে গেল ‘মেন্দা’, তাদের বাড়িগুলো হয়ে গেল ‘মেন্দাবাড়ি’। যদিও এসব বাড়ির কেউ নামের শেষে পদবি লেখেন না। শব্দটি তাদের পছন্দ নয়। কিন্তু পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া পদবি মুছে ফেলতেও পারেন না।
আমার মন জুড়ে মেদিনীমন্ডল, চোখ জুড়ে মেদিনীমন্ডল। ছেলেবেলায় নিবিড়ভাবে দেখা গ্রামটির অনুপুঙ্খ আমি চোখ বুজলেই মনে করতে পারি। মনীন্দ্র ঠাকুরের বাড়িটি ছিল যেন এক বনভূমি। সেই বাড়ি ঘিরে কত দিনকার কত স্মৃতি! খানবাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা সড়ক চলে গেছে কালীরখিলের দিকে। এ সড়কের পশ্চিমে বিল। বিলের মাঝখানে একাকী একটি বাড়ি, লোকে বলে ‘বিলেরবাড়ি’। গ্রামের গোরস্তানটা সেই বাড়ির কাছে। কত ভুতুড়ে গল্প ওদিকটা ঘিরে। লোকে একা যেতে ভয় পেত।
মেদিনীমন্ডলের জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠেছিলাম। কত দিনকার কত স্মৃতি এই গ্রামে। কত জন্ম-মৃত্যুর খেলা দেখেছি, কত অভাব, দারিদ্র্য আর ধান, পাট, তিল, কাওনে ভরা সুখের দিন দেখেছি। এক দুপুরে নানাবাড়ির পশ্চিমের চকে এক কৃষককে দা দিয়ে কুপিয়ে ঘায়েল করল তার শত্রুরা। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বারবাড়ির দিকে। চোখের সামনে দেখলাম সেই দৃশ্য। ’৬৫ সালের বর্ষাকালের এক রাতে মনীন্দ্র ঠাকুর ও ধীরেন চৌধুরীকে গলা কেটে হত্যা করল কারা। জীবনে সেই প্রথম গলাকাটা লাশ দেখেছি। মুকসেদ আলী নামে এক চোর ছিল গ্রামে। লোকে বলত ‘মুকসেইদ্দা চোরা’। পুলিশ তাকে ধরে মার শুরু করলে, পুলিশি লাঠির প্রথম বাড়িটি খেয়ে সে নাকি ‘বিসমিল্লাহ’ বলত।
গ্রীষ্মকালকে এ অঞ্চলে বলা হয় ‘খরালিকাল’। আমার কত খরালিকাল কেটে গেছে মেদিনীমন্ডলে, কত নিবিড় বৃষ্টির বর্ষাকাল কেটেছে। কত ফুলের গন্ধে সুবাসিত বসন্ত দিন কেটেছে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতকাল কেটে গেছে গাছের পাতা নিথর করে। আবার গাছের পাতায় পাতায় দেখেছি আলোর নাচন, ঘাসের ডগায় ডগায় দেখেছি সাদা পুঁতির মতো শিশির বিন্দু। বিলের ওপারে অস্ত যাচ্ছে ফাগুন দিনের সূর্য। মাঠের সবুজ ঘাস শেষ বিকালের আলোয় হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকত। মাঠপাড় মুখরিত হয়ে থাকত ডাহুক পাখির ডাকে। পুরান বাড়ির তালগাছে বাবুই পাখির বাসা। সেই সব পাখি উড়ে উড়ে এখনো আমায় ডাকে। মেদিনীমন্ডল, আমার মেদিনীমন্ডল।




