যে দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছে মুসলিম সমাজ

প্রতীকী ছবি
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি এমন একটি ধর্ম, যা মানুষকে নিজে সৎ পথে চলার পাশাপাশি অন্যকেও সত্যের পথে আহ্বান জানাতে শিক্ষা দেয়। একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু নামাজ, রোজা বা অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা, অন্যায় প্রতিরোধ এবং মানুষকে আল্লাহর পরিচয় ও দ্বীনের সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াও তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অথচ বাস্তবতা হলো, অনেক মুসলিম নিজের আমলের ব্যাপারে সচেতন হলেও দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসীন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা আল-আসর, আয়াত: ১-৩)। এই সংক্ষিপ্ত সুরায় মুক্তির জন্য চারটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যক্তিগত ঈমান ও আমলের পাশাপাশি অন্যকে সত্যের উপদেশ দেওয়াকেও মুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইসলামে দাওয়াতি কাজ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং তা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের অভিভাবক। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ৭১)। অন্যেএক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দেবে, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণই হলো মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমগ্র জীবন ছিল দাওয়াত, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটি আয়াত হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ৩৪৬১)। এই হাদিস প্রমাণ করে, দাওয়াত দেওয়ার জন্য বড় আলেম হওয়া শর্ত নয়। যে ব্যক্তি কোরআন-সুন্নাহর কোনো বিশুদ্ধ শিক্ষা জানে, সে তা যথাযথভাবে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
দাওয়াতি কাজের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহ্বান করে, যারা তার অনুসরণ করবে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব সে পাবে; তবে অনুসারীদের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৪)। এটি এমন একটি নেক আমল, যার প্রতিদান একজন মানুষের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকতে পারে। কারণ তিনি যে জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন, তা থেকে মানুষ উপকৃত হতে থাকলে তার আমলনামায় সওয়াব যোগ হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)।
বর্তমান যুগে দাওয়াতের ক্ষেত্র আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। পরিবার, প্রতিবেশী, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সর্বত্রই ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। তবে দাওয়াত হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নম্রতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমার রবের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫)।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, দাওয়াতি কাজ শুধু আলেমদের দায়িত্ব নয়; এটি সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। নিজের জীবনকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করার পাশাপাশি অন্যের কল্যাণ কামনা করাও একজন মুমিনের পরিচয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত যথা সম্ভব কোরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা, নিজে তা অনুসরণ করা এবং সুন্দর আচরণ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "কথার দিক থেকে তার চেয়ে উত্তম আর কে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।" (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩)।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে দীনি দাওয়াতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেয়া্র তাওফীক দান করুন।




