সন্তানদের প্রতি ভালোবাসায় সমতা, নাকি ন্যায়?

প্রতীকী ছবি
সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই এক রকম হয় না। কোনো সন্তান হয়তো বেশি শান্ত ও বাধ্য, কেউ একটু চঞ্চল; কেউ পড়াশোনায় ভালো, আবার কেউ অন্য কোনো গুণে এগিয়ে। স্বভাব, মেধা বা প্রয়োজনের কারণে বাবা-মায়ের আচরণেও কিছুটা পার্থক্য দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই পার্থক্য যেন কোনো সন্তানের প্রতি অন্যায় পক্ষপাত বা বৈষম্যে পরিণত না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি। ইসলাম সন্তানদের ভালোবাসা ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে এমনই ন্যায়ভিত্তিক আচরণের শিক্ষা দিয়েছে।
সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَامِرٍ قَالَ سَمِعْتُ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُوْلُ أَعْطَانِيْ أَبِيْ عَطِيَّةً فَقَالَتْ عَمْرَةُ بِنْتُ رَوَاحَةَ لَا أَرْضَى حَتَّى تُشْهِدَ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَتَى رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ إِنِّيْ أَعْطَيْتُ ابْنِيْ مِنْ عَمْرَةَ بِنْتِ رَوَاحَةَ عَطِيَّةً فَأَمَرَتْنِيْ أَنْ أُشْهِدَكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلَدِكَ مِثْلَ هَذَا قَالَ لَا قَالَ فَاتَّقُوْا اللهَ وَاعْدِلُوْا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
আমির (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নুমান ইবনে বাশীর (রা.)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে ন্যায় রক্ষা কর। (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)
হাদিসের শেষাংশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টিকে শুধু পারিবারিক সৌজন্যের পর্যায়ে রাখেননি; এর সঙ্গে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ সন্তানদের প্রতি অন্যায় আচরণ কেবল পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার বিষয় নয়, এটি একজন মুমিনের আল্লাহভীতিরও পরীক্ষা।
একজন সন্তানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা অন্যায়। ইসলাম সেটিকে স্বাভাবিক পারিবারিক আচরণ হিসেবে মেনে নেয় না।
তবে এখানে সমতা ও ন্যায়বিচারের পার্থক্য বোঝা জরুরি। সব সন্তানকে সবকিছু হুবহু সমান দেওয়া সবসময় ন্যায়বিচার নয়। কোনো সন্তান অসুস্থ হলে তার চিকিৎসায় বেশি ব্যয় হতে পারে, কারও বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও প্রয়োজন তুলনামূলক কম হতে পারে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে পার্থক্য করা অন্যায় নয়। অন্যায় হলো অকারণে একজনকে প্রিয় বলে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া এবং অন্যজনকে বঞ্চিত করা।
বৈষম্য শুধু অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রেই হয় না। বাবা-মায়ের আচরণেও তা প্রকাশ পেতে পারে। একজন সন্তানের প্রতিটি কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা, অথচ অন্যজনের কথা বারবার উপেক্ষা করা; একজনের ভুল সহজে ক্ষমা করা, অন্যজনের সামান্য ভুলেও কঠোর হওয়া; কিংবা ছেলে ও মেয়ের মধ্যে অযৌক্তিক পার্থক্য তৈরি করা সন্তানের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
পবিত্র কোরআন ন্যায়বিচারের ব্যাপারে সাধারণ নীতি ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সৎকর্মের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)। পরিবার সেই নীতির বাইরে নয়।
তাই সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার শুধু সম্পদ বণ্টনের বিষয় নয়; এটি ভালোবাসা, সম্মান, আচরণ ও সুযোগের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের শিক্ষা। বাবা-মায়ের একটি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ হয়তো কয়েক মুহূর্তের, কিন্তু তার ক্ষত সন্তানের মনে থেকে যেতে পারে বহু বছর।
সন্তানকে সমান করে দেখা সবসময় সম্ভব নয়; কিন্তু ন্যায় করে দেখা সম্ভব। আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাও তাই।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



