মহররম নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও ইসলামের সঠিক শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
মহররম ইসলামের সম্মানিত মাসগুলোর একটি। হিজরি সনের প্রথম মাস হিসেবে এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে এই মাসকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু সঠিক শিক্ষা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রচলিত আছে নানা ভুল ধারণা, ভিত্তিহীন কাহিনি ও অতিরঞ্জিত বক্তব্য। কোরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামি ইতিহাসের আলোকে এসব বিষয়ে সঠিক ধারণা গ্রহণ করা জরুরি।
মহররম শুধু শোকের মাস নয়
মহররম সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, এটি শুধু শোকের মাস। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়। ৬১ হিজরির ১০ মহররম ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীদের শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর বেদনার বিষয়। তবে মহররমের মর্যাদা শুধু কারবালার ঘটনার কারণে নয়; বরং ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এ মাস সম্মানিত।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।’ (সুরা তাওবা আয়াত : ৩৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে সম্মানিত মাসগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘বছর হলো বারো মাসের। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত: তিনটি ধারাবাহিক জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং আরেকটি হলো রজব।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১৯৭)
অতএব মহররমকে শুধু শোকের মাস বলা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকে সীমিত করে ফেলা।
আশুরার রোজা সম্পর্কে ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, আশুরার দিনের কোনো বিশেষ আমল নেই অথবা এটি শুধু ঐতিহাসিক স্মরণের দিন। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এই দিনে রোজা রেখেছেন এবং সাহাবাদের উৎসাহিত করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি বললেন, ‘এটি কী?’ তারা বলল, ‘এটি একটি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতা হিসেবে এ দিনে রোজা রাখতেন।’ তখন নবী (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৩০)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
এ কারণে আশুরার রোজা মহররমের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।
মহররমকে অশুভ মনে করা ভুল
সমাজে প্রচলিত আছে, মহররম মাসে বিয়ে করা, নতুন কাজ শুরু করা বা আনন্দের কোনো অনুষ্ঠান করা অশুভ। এটি ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং কুসংস্কার।
আল্লাহ তাআলা সময়, দিন ও মাসকে তার হিকমত অনুযায়ী মর্যাদা দিয়েছেন। কোনো মাসকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বানানোর অনুমতি ইসলাম দেয়নি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো রোগ নিজে নিজে সংক্রমিত হয় না, কোনো অশুভ লক্ষণ নেই এবং পেঁচা বা সফর মাসকে অশুভ মনে করার কোনো ভিত্তি নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭৫৭; মুসলিম, হাদিস : ২২২০)
যদি সফর মাসের মতো কোনো মাসকেও অশুভ মনে করা নিষেধ হয়, তাহলে মহররমকে অমঙ্গল মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি সম্মানিত মাস।
আশুরা নিয়ে ভিত্তিহীন কাহিনি প্রচার
মহররমের ১০ তারিখ নিয়ে সমাজে অনেক গল্প প্রচলিত আছে, যেগুলোর নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। যেমন, এ দিনে পৃথিবীর সৃষ্টি, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া, বিশেষ খাবার রান্না করলে নির্দিষ্ট ফজিলত পাওয়া ইত্যাদি।
ইসলামের মূলনীতি হলো, কোনো আমল বা বিশ্বাস গ্রহণ করতে হলে তার দলিল থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা আল-ইসরা আয়াত : ৩৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর এমন কোনো কথা আরোপ করবে যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৯)
তাই ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি যাচাই করা জরুরি।
কারবালার শিক্ষা ও অতিরঞ্জন
কারবালার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইমাম হুসাইন (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় নাতি। তার শাহাদাত মুসলিম হৃদয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি করে। তবে কারবালার শিক্ষা শুধু কান্না বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং নীতির ওপর অটল থাকার শিক্ষা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ
‘তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ১১৩)
তবে কারবালার ঘটনা নিয়ে এমন অনেক বর্ণনা প্রচলিত হয়েছে যেগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো সহিহ তথ্য গ্রহণ করা এবং মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত বর্ণনা থেকে বিরত থাকা।
মহররমের প্রকৃত শিক্ষা
মহররম আমাদের শিক্ষা দেয় আল্লাহর আনুগত্য, ধৈর্য, আত্মসংযম ও সত্যের পথে অটল থাকার কথা। আশুরার রোজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। কারবালার ঘটনা শিক্ষা দেয় অন্যায়ের সামনে নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি দিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৪০; মুসলিম, হাদিস : ১১৫৩)
সুতরাং মহররমকে কুসংস্কার, ভিত্তিহীন গল্প বা অতিরঞ্জিত আবেগ দিয়ে নয়, বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বোঝা উচিত। এ মাস মুসলিমদের জন্য আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার অনুপ্রেরণার মাস।




