যে কারণে আরাফার দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়

সংগৃহীত ছবি
ইসলামে কিছু সময়কে আল্লাহ তা আলা বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত দান করেছেন। যেমন রমজানের শেষ দশক, জুমার দিন, শবে কদর কিংবা আশুরার দিন। তবে বছরের দিনগুলোর মধ্যে এমন একটি দিন আছে, যেদিন আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও দয়ার দরজা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে খুলে দেওয়া হয়। সেই দিনটি হলো ৯ জিলহজ, আরাফার দিন।
হজের মূল কেন্দ্রবিন্দু এই দিন। লক্ষ লক্ষ হাজি সেদিন আরাফার বিশাল ময়দানে দাঁড়িয়ে কান্না, তাওবা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন। আর যারা হজে নেই, তারাও রোজা, দোয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে এই দিনের ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করেন। কোরআন, হাদিস ও মুসলিম স্কলারদের ভাষ্য থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আরাফার দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি বলা হয় বহু কারণেই।
প্রথমত, এ দিনেই আল্লাহ দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩)
হযরত উমর (রা.) বলেছেন, এই আয়াত নাজিল হয়েছিল আরাফার দিন, জুমার দিনে। (বুখারি, হাদিস : ৪৫)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন— ‘এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। কারণ আল্লাহ এ দিনে দ্বীনকে পরিপূর্ণ ঘোষণা করেছেন।’ (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৩/২৬)
দ্বিতীয়ত, আরাফার দিন হজের মূল স্তম্ভ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
»الحج عرفة«
‘হজ হলো আরাফা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮৮৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৯৪৯)
মুহাদ্দিসগণ বলেন, এ হাদিসের অর্থ হলো, আরাফায় অবস্থান ছাড়া হজ সম্পন্ন হয় না। তাই হজের প্রাণ ও আত্মা এই দিনেই কেন্দ্রীভূত।
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন— ‘আরাফায় অবস্থান হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন।’ (আল-মিনহাজ শরহু সহিহ মুসলিম, ৮/১৮৩)
তৃতীয়ত, এ দিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আরাফার দিনের চেয়ে বেশি এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)
হাদিসের পরবর্তী অংশে এসেছে, আল্লাহ তাআলা আরাফার ময়দানে অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন।
ইমাম ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেছেন— ‘এই হাদিস আরাফার দিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও আল্লাহর বিশেষ রহমতের প্রমাণ।’ (আত-তামহিদ, ১/১২৮)
চতুর্থত, আরাফার দিন দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেছেন—
»خير الدعاء دعاء يوم عرفة«
‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৮৫)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মুবারকপুরি (রহ.) বলেন— ‘এ দিনে দোয়ায় ইখলাস ও কবুলিয়াতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি, ১০/৩৩)
এ কারণেই আরাফার দিনকে দোয়া, কান্না ও তাওবার দিন বলা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।
পঞ্চমত, আরাফার রোজার ফজিলত অত্যন্ত বড়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
ইমাম নববি (রহ.) বলেন—‘এ হাদিসে আরাফার রোজার মহান মর্যাদা প্রমাণিত হয়।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ৮/৫১)
তবে আলেমরা স্পষ্ট করেছেন, এখানে ছোট গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বড় গুনাহ থেকে তাওবা করা আবশ্যক।
ষষ্ঠত, আরাফার দিন মূলত তাওবা ও আত্মসমর্পণের দিন। আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থা কিয়ামতের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাদা ইহরামে লাখো মানুষ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কাঁদছে, কেউ হাত তুলে ক্ষমা চাইছে। এই দৃশ্য মানুষের অন্তরে আখিরাতের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
ইমাম গাজালি (রহ.) লিখেছেন— ‘আরাফার সমাবেশ কিয়ামতের ময়দানের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৫৮)
সপ্তমত, আল্লাহ আরাফার দিনের শপথ করেছেন। কোরআনে এসেছে—
وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ
“শপথ উপস্থিতকারী ও উপস্থিতকৃত দিনের।” (সুরা বুরুজ, আয়াত : ৩)
অনেক মুফাসসিরের মতে, এখানে ‘মাশহুদ’ দ্বারা আরাফার দিনকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে তাবারি, ২৪/২৯৪)
কারণ এ দিনে মানুষ, ফেরেশতা ও রহমত এক অসাধারণ পরিবেশে সমবেত হয়।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ আনন্দের জন্য অসংখ্য দিবস উদযাপন করে। কিন্তু আরাফার দিন মানুষকে শেখায়, জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা দুনিয়ার ভোগে নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জনে।
এ কারণেই সালাফে সালেহীনরা এ দিনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। কেউ রোজা রাখতেন, কেউ দীর্ঘ দোয়া করতেন, কেউ কোরআন তিলাওয়াতে সময় কাটাতেন।
হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) বলতেন— ‘আরাফার দিনের চেয়ে শয়তানকে আর কোনো দিন এত অপমানিত ও ক্রুদ্ধ দেখা যায় না।’ (মুআত্তা মালিক, হাদিস : ৯৪২)
কারণ এ দিন আল্লাহ অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন।
আরাফার দিন মূলত মানুষের রবের দিকে ফিরে আসার দিন। এটি গুনাহ থেকে মুক্তির দিন, কান্নার দিন, দোয়ার দিন, নতুন জীবনের অঙ্গীকারের দিন। তাই মুসলিম হৃদয়ে এ দিনের মর্যাদা অন্যসব দিনের চেয়ে আলাদা।
মহান আল্লাহ আমাদের আরাফার দিনের রহমত, ক্ষমা ও বরকত দ্বারা ধন্য করুন এবং এ দিনের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।






