আরাফায় অবস্থান কেন হজের মূল স্তম্ভ

ছবি: এআই
পৃথিবীর বুকে অসংখ্য জনসমাবেশ ঘটে। কোথাও রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শন, কোথাও অর্থনৈতিক মেলা, কোথাও সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু এমন একটি সমাবেশ আছে, যেখানে মানুষের পরিচয়, বংশ, ভাষা, পদমর্যাদা ও জাতিগত অহংকার এক সাদা কাপড়ে এসে বিলীন হয়ে যায়। যেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ সবাই একই প্রার্থনায় মাথা নত করে। সেই সমাবেশের নাম আরাফাতের ময়দান। হজের প্রাণ, হজের হৃদয়, হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
ইসলামের ইতিহাসে আরাফার দিন শুধু একটি আচার নয়; এটি মানুষের আত্মসমর্পণ, ক্ষমাপ্রার্থনা ও আখিরাতচেতনার সর্বশ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন—
»الحج عرفة«
‘হজ হলো আরাফা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮৮৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৯৪৯)
মুহাদ্দিসগণ বলেন, এ হাদিসে ‘হজ হলো আরাফা’ বলার অর্থ, আরাফায় অবস্থান ছাড়া হজই সম্পন্ন হয় না। যেমন নামাজে সিজদা বাদ গেলে নামাজ হয় না, তেমনি আরাফায় অবস্থান বাদ গেলে হজ বাতিল হয়ে যায়।
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন— ‘এই হাদিসের অর্থ হলো, আরাফায় অবস্থান হজের সবচেয়ে বড় রুকন। এটি ছাড়া হজ সহিহ হবে না।; (আল-মিনহাজ শরহু সহিহ মুসলিম, ৮/১৮৩)
পবিত্র কুরআনেও আরাফার গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ
‘অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন মাশআরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯৮)
মুফাসসিরগণ বলেন, এ আয়াতে ‘আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন’ উল্লেখ করা প্রমাণ করে যে আরাফায় অবস্থান হজের অপরিহার্য অংশ। কারণ আল্লাহ এমন একটি আমলের কথা বলেছেন, যেখান থেকে ফিরে আসা হজের ধারাবাহিকতার কেন্দ্রীয় অংশ।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন— ‘এই আয়াত আরাফায় অবস্থানের ফরজ হওয়ার অন্যতম দলিল।’ (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ২/৪১৯)
হজের অন্যান্য আমল নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিকল্প বা ক্ষতিপূরণের সুযোগ রাখলেও আরাফার ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। কেউ যদি আরাফার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারেন, তার হজই আদায় হবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘যে ব্যক্তি ফজরের আগে আরাফা পেয়ে গেল, সে হজ পেয়ে গেল।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৯৫০; নাসাঈ, হাদিস : ৩০১৬)
ফকিহগণ এ হাদিস থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ৯ জিলহজ সূর্য ঢলার পর থেকে ১০ জিলহজ ফজর পর্যন্ত আরাফার ময়দানে সামান্য সময়ের জন্যও উপস্থিত হতে পারলে হজ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে উপস্থিত না হলে হজ বাতিল বলে গণ্য হবে।
ইবনে কুদামা (রহ.) লিখেছেন— ‘মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, আরাফায় অবস্থান হজের রুকন এবং এটি ছাড়া হজ সম্পন্ন হয় না।’ (আল-মুগনি, ৩/২১৪)
আরাফার দিনের আধ্যাত্মিক গুরুত্বও অসাধারণ। সহিহ মুসলিমে এসেছে— ‘আরাফার দিনের চেয়ে বেশি এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)
ইমাম ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেন— ‘এ হাদিস প্রমাণ করে, আরাফার দিন আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের সবচেয়ে বড় মৌসুম।’ (আত-তামহিদ, ১/১২৭)
আরাফার ময়দানের সঙ্গে কিয়ামতের ময়দানের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সাদা কাপড়ে, খোলা আকাশের নিচে, কোনো পার্থিব অলংকার ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কাঁদছে, কেউ তাওবা করছে, কেউ হাত তুলে ক্ষমা চাইছে। এই দৃশ্য মানুষকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) লিখেছেন— ‘আরাফার ময়দানে মানুষের সমবেত হওয়া কিয়ামতের দিনের সমাবেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণও এই আরাফাতের ময়দানেই প্রদান করেছিলেন। সেখানে তিনি মানবাধিকার, নারীর মর্যাদা, সুদ নিষিদ্ধকরণ, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার নির্দেশনা দেন।
জাবির (রা.) বর্ণনা করেন— ‘নবী (সা.) আরাফার দিন মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন…’ (মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)
ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে এটি মানবমুক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত।
আরাফার দিন দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। হাদিসে এসেছে—
»خير الدعاء دعاء يوم عرفة«
‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৮৫)
আরাফায় অবস্থানের মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনের সমস্ত অহংকার ভেঙে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়। এখানে কোনো রাজকীয় পোশাক নেই, পদ-পদবি নেই, সামাজিক শ্রেণি নেই। আছে শুধু এক অসহায় বান্দা এবং তার রবের সামনে কান্নাভেজা আত্মসমর্পণ।
এ কারণেই হজের কেন্দ্রবিন্দু আরাফা। তাওয়াফ, সাঈ, মিনায় অবস্থান, কোরবানি সবই গুরুত্বপূর্ণ আমল; কিন্তু আরাফা সেই ময়দান, যেখানে হজের আত্মা জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাই ফকিহরা বলেন, ‘যে আরাফা পেল, সে হজ পেল; আর যে আরাফা হারাল, সে হজ হারাল।’
মহান আল্লাহ আমাদের হজের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার তাওফিক দিন এবং আরাফার দিনের রহমত ও ক্ষমা দ্বারা আমাদের জীবন আলোকিত করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






